সরকার ও এনজিওর কাজ নলকূপ বসিয়ে শেষ, দেখভালে বরাদ্দ নেই

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার আর্সেনিকপ্রবণ একটি গ্রাম অলিনগর। একটি বেসরকারি সংগঠন এলাকার ২০টি পরিবারের পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে গ্রামের আলীবাড়িতে একটি গভীর নলকূপ বসিয়ে দিয়েছিল। তবে বছর পেরোতেই নলকূপটি নষ্ট হয়ে যায়। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাওয়া আলীবাড়ির শরীয়তুল্লাহ জানান, নলকূপটি নষ্ট হওয়ার পর সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা আর সহায়তা করেনি। ‘এলাকাবাসী চাঁদা তুলে নলকূপটি কয়েকবার ঠিক করলেও বারবার নষ্ট হওয়ায় এখন আর ঠিক করছে না। আমাদের অনেক টাকা চলে গেছে।’ বললেন শরীয়তুল্লাহ।
দেশের অন্যতম আর্সেনিকপ্রবণ জেলা চাঁদপুরে ২০০০ সাল থেকে কয়েক বছরে সরকারি ও বেসরকারি আর্থিক সহায়তায় বসানো হয় আর্সেনিকমুক্ত ৩০ হাজার ২৩৫টি নলকূপ। এগুলোর মধ্যে এখন ছয় হাজার ৯১৬টিই নষ্ট।nolkup
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয় সাধারণত গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে। কিন্তু এসব নলকূপের রক্ষণাবেক্ষণ কেউ করে না। সরকারের নেই রক্ষণাবেক্ষণের খরচের ব্যবস্থা। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্পের মেয়াদ ফুরালেই হাত গুটিয়ে নেয়।
সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় নলকূপ নষ্ট হয়ে যায়। তখন তা সারানোর দায় পড়ে গরিব মানুষের ওপর। অচল নলকূপ সচল করার ব্যয়ও কম নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটার এইড বাংলাদেশের ওপর তাদের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় বলেছে, একটি পানি তোলার স্থাপনা ১০ বছর টিকলে সেই ১০ বছরে এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হয় স্থাপন ব্যয়ের নয় গুণ অর্থ। ওয়াটার এইড দরিদ্র জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত প্রাকৃতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ আটটি এলাকার ওপর গবেষণা পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে আছে বড় ও ছোট শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের জনবসতি, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে থাকা এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বন্যা-খরা-আর্সেনিকপ্রবণ ও হাওর অঞ্চলের আটটি এলাকা।
‘বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরে পানি তোলার ক্ষেত্রগুলোর (নলকূপ) আয়ুষ্কালের ব্যয় এবং দরিদ্র মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার’ শিরোনামের গবেষণা গত বছরের জুন মাসে শুরু হয়ে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে। এর আওতায় বিভিন্ন ধরনের গভীর ও অগভীর নলকূপের সুবিধাভোগী এক হাজার ২৯৫টি পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ছোট শহরে একটি শ্যালো মেশিন (অগভীর নলকূপ) বসাতে খরচ হয় সাড়ে ১৮ হাজার টাকা। তবে ১০ বছর ধরে স্থাপনা ব্যয়সহ এর রক্ষণাবেক্ষণে খরচ হয় প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার টাকা। হাওর অঞ্চলে খরচ দাঁড়ায় দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় একটি গভীর নলকূপের স্থাপনা ব্যয় ৩১ হাজার টাকা। ১০ বছর টিকলে এর পেছনে খরচ দাঁড়ায় প্রায় আড়াই লাখ টাকা। গবেষণায় বলা হয়, দেখভাল করার সঠিক ব্যবস্থা না থাকার কারণে নলকূপগুলো ক্রমে অকেজো হয়ে পড়ে।
নলকূপ অকেজো হওয়া একটি কারিগরি বাস্তবতা এবং সাধারণ চিত্র হওয়া সত্ত্বেও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ সরকারের কোনো ব্যয় বরাদ্দ নেই।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ পানি সরবরাহের বিষয়টি দেখভাল করে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু আলম মো. শহিদ খান প্রথম আলোকে বলেন, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের ব্যবস্থা নেই। তবে স্থানীয় মানুষকে দিয়ে কমিটির ব্যবস্থা থাকে। এদের ওপর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকে।
দরিদ্র সাধারণ মানুষের ওপর রক্ষণাবেক্ষণের খরচের ভার দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত—এ প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা খোঁজ নেব। যদি গরিব মানুষের জন্য ব্যয় বহন সত্যিই কষ্টকর হয়, তবে তা লাঘব করতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ওয়াটার এইডের গবেষণায় রক্ষণাবেক্ষণের যে ব্যয় দেখানো হয়েছে তা ‘স্বাভাবিক মনে হচ্ছে’ না বলে মন্তব্য করেন সচিব।
পানি সরবরাহবিষয়ক স্থাপনা নির্মাণের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের। অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ গোলাম মোক্তাদির স্বীকার করেন, পানির স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি সরকারি স্তরে উপেক্ষিত থাকে। তিনি বলেন, ব্যবহারকারীদেরই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে রাখার বিষয়টি হয়তো পরিবর্তন করার সময় এসেছে।
গোলাম মোক্তাদির মনে করেন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের এ দায়িত্ব নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সামর্থ্য নেই। এর জন্য স্থানীয় সরকার পরিষদগুলোকে নিয়োজিত করার পরামর্শ দেন তিনি।
তবে স্থানীয় সরকারসচিব এতে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, স্থানীয় সরকার পরিষদকে এ দায়িত্ব দিলে রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে জটিলতা আরও বাড়বে। তিনি স্থানীয় মানুষকে দায়িত্ব দিয়ে কীভাবে আরও সক্রিয় করা যায়, সে বিষয়ে ভাবার পরামর্শ দেন।
২০১২-১৩ অর্থবছরে সরকারের নেওয়া গ্রামীণ পানি সরবরাহ প্রকল্পে ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯৬ ভাগ অর্থই এক লাখ ২০ হাজারের বেশি নলকূপ স্থাপনের ব্যয়। প্রকল্পে রক্ষণাবেক্ষণকাজের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। শহর-গ্রাম বৈষম্যের বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে প্রকট। ২০০৭-০৮ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকার চার হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি খরচ করে পানি সরবরাহ ক্ষেত্রে। এর মধ্যে মাত্র ৭৮৩ কোটি টাকা গ্রামাঞ্চলে ব্যয় করা হয়েছে। অথচ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশের ৭৬ শতাংশ মানুষের বাসই গ্রামে।
এ অবস্থায় নলকূপ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ভার থেকে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে রক্ষা করতে সরকারি অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা দরকার বলে মনে করেন ওয়াটার এইডের বাংলাদেশ প্রধান খায়রুল ইসলাম। এ ব্যয়কে নানা স্তরে ভাগ করার পরামর্শ দেন তিনি। আর তাঁর মতে, বেসরকারি উদ্যোগের ক্ষেত্রে প্রকল্পের মেয়াদ শেষের পরও যাতে স্থাপনা সচল থাকে, তা নিশ্চিত করাটাও জরুরি।
**এ প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আলম পলাশ, চাঁদপুর ও কৃষ্ণ চন্দ্র দাস, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

সুত্রঃ প্রথম আলো, ২২,০৩,২০১৩

Check Also

Villagers of kombonia struggling for drinking water

Nurul Alam is one of the villagers and school teacher of the only primary school. He is the first person who passed S.S.C. among the villagers. He discussed the villager’s suffering for drinking water with me, which he witnessed from his childhood.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *