পার্বত্যাঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির হাহাকার

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়াছে। পানির কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক উত্সগুলি নষ্ট হইবার কারণেই ইহা ঘটিয়াছে। উপরন্তু, দীর্ঘদিন দেখভালের অভাবে জেলা সদরসহ পাহাড়ি গ্রামগঞ্জে স্থাপিত পাঁচ সহস্রাধিক গভীর ও অগভীর নলকূপ, তারা পাম্প এবং পাতকূপ বিকল থাকায় পরিস্থিতি অসহনীয় হইয়া উঠিয়াছে। গত দেড় যুগ ধরিয়া জেলায় বিশুদ্ধ পানীয় জলের উত্স সৃষ্টি করিবার জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, জেলা পরিষদ ও অন্যান্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী অর্থ যোগান দিয়াছে।22 April Bandorban.jpg-2009-04-22- কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনর অভাবে তৃণমূল পর্যায়ে বরাদ্দের অধিকাংশই কার্যকর হয় নাই। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ জেলায় নলকূপ স্থাপনের যে পদক্ষেপ নিয়াছে তাহাও পর্যাপ্ত নহে। জেলার সাধারণ মানুষের সুপেয় পানি চাহিদার মাত্র ৫৮ ভাগ পূরণ করিতে সক্ষম হইতেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ। তাহাদের নানা অব্যবস্থাপনার কারণে জেলার অধিকাংশ মানুষ সুপেয় পানি পাইতেছে না বলিয়াই অভিযোগ রহিয়াছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির এই সংকট আরও বাড়িবে।

বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকারের এই চিত্র কেবল খাগড়াছড়ি নহে, পুরা পাহাড় জুড়িয়াই দেখা যাইবে। দেশের সমতল অঞ্চলে পানির প্রবাহ বিদ্যমান থাকিলেও তাহার বিপরীত চিত্র দেখা যাইবে পার্বত্যাঞ্চলে। উঁচু-নিচু ঢেউ তোলা পাহাড়ের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখে শান্তির পরশ বুলাইয়া দিলেও পানির পিয়াস মিটানো কষ্টসাধ্য। পাহাড়ি জনগণকে নিরাপদ পানি সংগ্রহের জন্য চালাইতে হয় নিরন্তর প্রয়াস। যাইতে হয় দূর হইতে দূরান্তরে। এক কলস পানি আনিতে কয়েক কিলোমিটার পাহাড়ি পথ অতিক্রম করিতে হয়। পাহাড়ের পাদদেশে ছড়া, ঝিরি এবং নদীর পানি তাহাদের একমাত্র অবলম্বন। দুর্গম জনবসতির হাজার হাজার পরিবারকে প্রাকৃতিক এইসব উত্স হইতে পাওয়া পানি দিয়া রান্না, গোসল, খাওয়া, থালাবাসন ধোওয়া ইত্যাদি চাহিদা পূরণ করিতে হয়। অগভীর নলকূপগুলি পানিশূন্য ও অকেজো হইয়া পড়ায় জনপদ, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দিরসহ সকল জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পানির জন্য হাহাকার চলিতেছে। জনস্বাস্থ্য বিভাগের সূত্র জানায়, পৌর শহরের লৌহমুক্ত পানি সরবরাহ সিস্টেম ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে। শহরের প্রায় অর্ধ লক্ষ মানুষের খাবার পানির চাহিদা পূরণে স্থাপিত ৯টি পানি উত্তোলকের মধ্যে ৬টি বর্তমানে অকেজো হইয়া রহিয়াছে। প্রতি বত্সর এই মৌসুমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিবাহিত রোগে অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সমপ্রতি হাসপাতালগুলিতে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, পেটব্যথা, টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগীর চাপ বাড়িয়া গিয়াছে।

বিশ্বের প্রায় ১১০ কোটি মানুষই (মোট জনসংখ্যার ছয় ভাগের এক ভাগ) এখন পানীয় জলের সংকটে কাতর। এই সংকট বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলিতে তুলনামূলকভাবে বেশি। আর্সেনিক সমস্যার সমাধান করিয়া ২০১১ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি এবং ২০১৩ সালের মধ্যে প্রতি বাড়িতে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করিবার অঙ্গীকার করিয়াছিল আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু দেশবাসী দূরে থাক, ঢাকা শহরের মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় পানির ব্যবস্থাটুকুও হয় নাই। আর, দুর্গম পাহাড়বাসির জন্য বিশুদ্ধ পানির বন্দোবস্ত তো নিতান্তই দূরাশা। অবাধে বৃক্ষনিধন ও পাচারের ফলে বিগত দুই দশকে সবুজ পাহাড়গুলি ক্রমশঃ বৃক্ষশূন্য হইয়াছে। ন্যাড়া পাহাড়গুলি প্রতিবত্সর বর্ষা মৌসুমে মাটি ক্ষয় হইয়া ধসিয়া পড়িতেছে, দেখা দিতেছে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অন্যদিকে, শুষ্ক মৌসুমে ঝিরি-ঝর্ণা, খালগুলি শুকাইয়া যাওয়ায় দেখা দিতেছে তীব্র পানির সংকট। প্রাকৃতিকভাবে মাটির নিচে পাথরের বেষ্টনী থাকার কারণে খাগড়াছড়ি জেলার ৮টি উপজেলার বিশাল এলাকায় অগভীর নলকূপ বসানোও যাইবে না। সেহেতু, পাহাড়ি এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করিতে হইলে গভীর নলকূপ স্থাপন, বর্ষা মৌসুমে প্রাকৃতিক পানি সংরক্ষণ এবং কৃত্রিম জালাধার সৃষ্টি ইত্যাদি বিকল্প পরিকল্পনা লইয়া আগাইতে হইবে।

সম্পাদকীয়, দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭,০৩,২০১৩

Check Also

Villagers of kombonia struggling for drinking water

Muntakim Mosnobi Mim Kombonia para is a large village of Whykong union under Teknaf Upzilla …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *