পূর্বাচল প্রকল্পের উন্নয়নে নির্বিচারে বৃক্ষনিধ

অরূপ দত্ত

   বড়কাউ গ্রামের এক বাড়ির সামনে গাছের বড় বড় ১০টি খণ্ড পড়ে আছে। সেদিকে যেতেই বৃদ্ধ জমিলা খাতুন কেঁদে উঠে বললেন, এগুলো লিচুগাছের টুকরা। তাঁর এই গাছটি অনেক বড় ছিল। এক মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার টাকার লিচু হতো। তিনি বললেন, ‘বিক্রি করতে চাইনি, ভয় দেখিয়ে এবং বালুর নিচে পুঁতে ফেলার হুমকি দিয়ে গাছ কেটেছে। পরে নামমাত্র দাম ফেলে গেছে।’
কে বা কারা গাছ কেটেছে—এ প্রশ্নের উত্তর দিতে ভয় পাচ্ছিলেন জমিলা। কেবল বড়কাউয়ের জমিলার একটি ফলদ গাছ নয়—ফলদ, বনজ ও ঔষধি মিলিয়ে ওই গ্রামসহ পাঁচটি গ্রাম ও বনের লক্ষাধিক গাছ নিধন করা হয়েছে। ওই গ্রামগুলো ও বন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নে অবস্থিত। সেখানে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল উপশহর প্রকল্প (কালীগঞ্জ) উন্নয়নের কাজ চলছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প উন্নয়নের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারের নিয়োজিত উপঠিকাদারেরা এই বৃক্ষনিধনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক বিলও ভরাট করছেন। তাঁরা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছও কেটে বিক্রি করছেন।
বাকি চারটি গ্রাম হলো বাশাবাশি, কালিকুঠি, গুচ্ছগ্রাম ও পারাবর্থা। এদিকে গত ১০ মে রাতে বড়কাউ গ্রামবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশের এক সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলার পর পাঁচটি গ্রামই প্রায় পুরুষশূন্য। এ সুযোগে চলছে নির্বিচারে গাছ কাটা ও বিল ভরাট। IMG_4604
তবে রাজউক বলেছে, প্রকল্প এলাকার ১২২ একর শালবন সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সেখানে কোনো গাছ কাটা হচ্ছে না।
পূর্বাচল প্রকল্পের জন্য গাজীপুর জেলা প্রশাসন কয়েক বছর আগে ওই এলাকায় প্রায় এক হাজার ৬০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে। গাজীপুর অংশের বিদ্যমান ভূমির জন্য তৈরি মানচিত্র থেকে জানা যায়, যে জায়গাটি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, সেখানে কৃষিজমি রয়েছে ৬২৯ দশমিক ৭ একর, বনভূমি ১৯০ দশমিক ৭৩ একর, মিশ্র বনভূমি ৪৮৬ দশমিক ৭৭, নিচু শ্রেণীর কৃষিজমি ৯৭ দশমিক ৭০ একর এবং বসতবাড়ি ১৫৫ দশমিক ৬০ একর।
অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকে অভিযোগ করেন, জমি অধিগ্রহণ করা হলেও তাঁদের অনেকে এখনো ক্ষতিপূরণ পাননি। ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবার জানায়, বিঘাপ্রতি এক লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ৫০ হাজার টাকাও অনেকে পাননি। জেলা প্রশাসনের অ্যাওয়ার্ড করাতে খরচ, টাকা নেওয়ার সময় কমিশন বাবদ খরচ ইত্যাদি নানা খরচের বেড়াজালে পড়তে হয়েছে তাঁদের।
বড়কাউ গ্রামটি ঢাকার উত্তরখান ইউনিয়নের ভাতুরিয়া গ্রামসংলগ্ন নলি ও বালু নদীর পূর্বপাড়ে। আরও পূর্বে পারাবর্থা। গত মঙ্গলবার সেখানে গেলে দূর থেকেই চোখে পড়ে, বালু নদীর পাড়ে লাল মাটির স্তূপ। অসংখ্য গাছসহ টিলা কেটে ফেলায় বেরিয়ে এসেছে লাল মাটি। নদীর ঘাটে তিনটি কার্গো। নদীর অন্যান্য স্থানে আছে আরও ২২টির মতো কার্গো। কার্গোতে বসানো মেশিন দিয়ে নদী থেকে বালু উঠিয়ে মোটা পাইপের মাধ্যমে ফেলা হচ্ছে প্রাকৃতিক বিল ও নিচু জমিতে। কাছেই দেখা গেল, শীর্ণপ্রায় একটি বিল। এলাকাবাসী বললেন, তিন মাস আগেও এই বিল অন্তত ২০০ ফুট চওড়া ছিল।
অভিযোগ পাওয়া গেল, যেসব ঠিকাদারকে উন্নয়নকাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাঁদের নিয়োজিত উপঠিকাদার ও তাঁদের ক্যাডাররা গ্রামবাসীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে খুব সস্তায় গাছ কিনে উজাড় করে দিয়েছে গ্রামকে গ্রাম। তাঁরা কারা, জানতে চাইলে গ্রামবাসীর অধিকাংশই মুখ খোলেননি। নাম প্রকাশ করা হবে না, এই শর্তে কয়েকজন জানান, ঠিকাদার আতাউর রহমানের উপঠিকাদার মো. সেলিম, কামাল, আলামীন, ইব্রাহিম মেম্বার, রফিকসহ আরও কয়েকজন ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁদের গাছ বিক্রি করতে বাধ্য করেন।
বড়কাউ গ্রামে ঢুকে দেখা যায়, বৃদ্ধা জমিলার লিচুগাছের মতো ফলভর্তি কাঁঠাল গাছ, তালগাছসহ সদ্য কাটা প্রচুর আম ও মেহগনিগাছ এখানে-সেখানে পড়ে আছে। মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বৈদ্যুতিক করাতের সাহায্যে কাটা হচ্ছিল একটি মেহগনিগাছ। সেখানে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা জানান, কিছুক্ষণ আগে উপঠিকাদার মো. সেলিম এসে হুমকি দিয়ে গেছেন, গাছ বিক্রি না করলে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হবে।
ঘটনাস্থলে সেলিম বা অন্যদের পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে মো. সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, তিনি কাউকে হুমকি দিয়ে গাছ কাটাননি। শালবনের গাছেও হাত দেওয়া হয়নি। তাহলে শালবনের কাছ কারা কাটছে—এ প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি।
ঠিকাদার আতাউর রহমান খানকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকজন এলাকাবাসী জানান, ঠিকাদারের কাছে অতিরিক্ত পয়সা পাওয়া যাবে না বলে তাঁকে না জানিয়ে উপঠিকাদারেরা গোপনে শালবনের গাছ কেটে বাইরে বিক্রি করছেন। রাজউকও বিষয়টি জানে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এখানে উন্নয়নের নামে যা হচ্ছে, তাতে রাজউক প্রণীত জলাধার সংরক্ষণ আইনও মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
একাধিক আবাসন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেন, রাজউক বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে গাছ না কাটার বা কৃষিজমি ব্যবহার না করারও শর্ত দেয়। কিন্তু পূর্বাচল প্রকল্পে এর কোনো কিছুই মানা হচ্ছে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, রাজউকের মতো সরকারি সংস্থা নিজেরাই যখন জলাধার সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে এবং নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলে, তখন সেটা হয় আরও বেশি অপরাধের। তিনি বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে আইনের আশ্রয় নিয়েছি।’ তিনি বলেন, প্রকল্প এলাকায় অনেক খালি জায়গা রয়েছে, সেখানে গাছও নেই, জলাধারও নেই। সেসব জমিতে রাজউক প্লট বরাদ্দ দিতে পারে।
পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের পরিচালক ও রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন দাবি করেন, বনাঞ্চল ধ্বংস না করে ১২২ একর বনভূমি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বসতবাড়ি ও বাগান সরকার হুকুমদখল করেছে। প্রকল্পের উন্নয়নের জন্য সেখানে কাজ হচ্ছে। ওই এলাকায় কোনো প্রাকৃতিক বিল নেই। কারণ, শুকনা মৌসুমে সেখানে ফসল চাষ হয়।
আনোয়ার হোসেন বলেন, এখানে কোনো কৃষিজমিও ধ্বংস করা হচ্ছে না। কারণ, এক ফসলি জমিকে কৃষিজমি হিসেবে দেখানো হয়নি। দুই ফসলি বা তিন ফসলি জমি প্রকল্পে নেই।
কী ঘটেছিল ১০ মে: এলাকাবাসী ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, উন্নয়নের বিরুদ্ধে এলাকার বাসিন্দাদের ক্ষুব্ধ করা হচ্ছে—এ অভিযোগে গত ১০ মে রাতে নাগরী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল কাদির মিয়াকে গ্রেপ্তার করতে তাঁর বড়কাউয়ের বাড়িতে যায় সাদা পোশাকের একদল পুলিশ। সে সময় তিনি বাড়ি ছিলেন না। একপর্যায়ে স্থানীয় মসজিদের মাইকে ঘোষণা করা হয়, ‘গ্রামে ডাকাত পড়েছে’। এতে গ্রামবাসী দা-কুড়াল নিয়ে বেরিয়ে আসে। পুলিশ বেশ কয়েকটি গুলি ছুড়ে গ্রামবাসীকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং তাঁদের হাসপাতালে নেওয়া হলে নায়েক আজিজুর রহমানকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
ওই ঘটনায় ১১ মে পুলিশ বাদী হয়ে কাদির মিয়া, উত্তরখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামাল উদ্দিনসহ ৫৫ জনের নাম উল্লেখসহ দেড় হাজার গ্রামবাসীকে আসামি করে কালীগঞ্জ থানায় মামলা করে। মামলার পর বড়কাউসহ পাঁচটি গ্রামের প্রায় সব পুরুষ গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয়ে গ্রাম ছাড়েন। পরে কাদিরসহ ৩৮ জন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁদের গাজীপুর কারাগারে পাঠানো হয়। মঙ্গলবার কাদিরসহ কয়েকজন জামিন পেয়েছেন।
মো. কামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচটি গ্রাম পুরুষশূন্য করে এলাকায় বৃক্ষনিধন ও বিল ভরাট করা হয়। রাজউকের অধিগ্রহণ করা এলাকায় তাঁর ৯০ বিঘা জমি পড়েছে। শুধু এ কারণে তাঁকে ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে। অথচ ১০ মে রাতে তিনি তাঁর উত্তরার বাসভবনে ছিলেন। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে তাঁকে হয়তো রাজউক একটি প্লট দেবে। কিন্তু প্লট বরাদ্দের নামে স্থানীয় মাস্তান বাহিনী দিয়ে লক্ষাধিক গাছ কেটে ফেলা এবং বিল ভরাট করার বিষয়টি কোনো বিবেকবান মানুষই মেনে নিতে পারবে না।

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো

Check Also

নাইট্রজেন চক্রের কথকতা, পর্ব-২

বাধাধরা নিয়মের পরেও লাগাম কেন হাতছাড়া এটা ধরতেই গবেষণা করেছেন ‘কলোরাডো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়’র গবেষকেরা। নাইট্রেট নিয়ে গবেষণা করলেও তারা কিন্তু অ্যামোনিয়ার বিষয়টি আসলে আগে বিবেচনায় আনেননি। ঝামেলাটা ধরা পড়ল সেখানেই। কৃষিক্ষেত্র থেকে নির্গত অ্যামোনিয়ার পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে জীবাশ্ম জ্বালানীকেও!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *