কম্পিউটার চিপে পরিবেশ আর স্বাস্থ্যঝুঁকি

সিফাত তাহজিবা

কম্পিউটার বা পিসি বা ল্যাপটপ অথবা নোটবুক – শব্দগুলোর সাথে আমরা এখন ব্যাপকভাবে পরিচিত, দিনের শুরু কিংবা শেষে, প্রশাসনিক বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে, বিনোদন আর শিক্ষায়, কোথায় নেই আজ কম্পিউটার!!! কম্পিউটারে ইনটারনেট ব্যবহার করে মানুষ আজ পুরো দুনিয়াকে নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়। একদিন আপনার কম্পিউটার নেই মানে যেন আপনার দুনিয়ায় কিছুই নেই।

আপনার প্রিয় কম্পিউটারটি যার মাধ্যমে আপনি পৃথিবীর একপ্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের খবর নিমিষেই পেয়ে যাচ্ছেন, সেটি যে বন্ধু বেশে আপনারই পিঠে ছুরি বসিয়ে দিচ্ছে তা’কি আপনি একবারও বুঝতে পারছেন? কি অবাক হচ্ছেন তাইতো??

তাহলে উপায়? আপনি কি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর আবিষ্কারকে ছুড়ে ফেলে দেবেন? খুবই দুশ্চিন্তার বিষয় তাইনা!!

কি এমন ক্ষতি করছে এই জড় পদার্থটি আমাদের ? কেনই বা এটিকে আমাদের পরিবেশ আর স্বাস্থ্যের জন্য একপ্রকার হুমকি বলে গণ্য করা হচ্ছে?? হ্যা, এই পিসি বা Personal computer যাই বলুন না কেন, আজ পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যর জন্য হয়ে উঠেছে বিপদজনক।computr chip

কেন, তা জানতে হলে অতীত থেকে একটু ঘুরে আসা যাক-

১৯৯৬ সালে ১২৮ জন আইবিএম ( International Business Machines Corporation-IBM) এর প্রাক্তন কর্মীর মধ্যে ১১ জনের পরিবার সহ সবাই ক্যান্সারে মারা যান। কারণ, তাদের Semi conductor বা অর্ধপরিবাহী কারখানায় এমন সব রাসায়নিক পদার্থর সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল যা এই ক্যান্সার রোগ বয়ে নিয়ে আসে। কম্পিউটার প্রস্তুত করতে ব্যবহৃত হয় কিছু চিপ যা এই সেমিকন্ডাক্টর দিয়ে গঠিত, এই চিপ গুলো কম্পিউটারের সিপিউ (CPU- Central Processing Unit) এবং মেমরীতে ব্যবহৃত হয়। এমনই দুটো অর্ধপরিবাহী হলো সিলিকন ও জার্মেনিয়াম।কম্পিউটারের এই চিপগুলো বানাতে সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় কিছু রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োজন হয় যা মারাত্মক ক্ষতিকর। এর সাথে কারখানা থেকে যে উপজাত বের হয়ে আসে তা বায়ুমন্ডলকে এবং ভূগর্ভস্থ পানিকে করছে দূষিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্টে বলা হয়েছে, সেমিকন্ডাক্টর কারখানার কাজে জড়িত এক তৃতীয়াংশ শ্রমিকের শারিরীক অসুস্থতা ধরা পড়ছে! কম্পিউটার প্রস্তুত বা সেমিকন্ডাক্টর কারখানায়  ব্যবহৃত ১০টি সবচাইতে প্রানঘাতী বা ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থের নাম দেখে নেয়া যাক –

রাসায়নিক পদার্থ যে কাজে ব্যবহার হচ্ছে আক্রান্ত মানব স্বাস্থ্য
এসিটোন সিলিকন চিপের রাসায়নিক-যান্ত্রিক মসৃণতা আনয়নে নাক, ​​গলা, ফুসফুস, চোখ জ্বালা, চামড়া ক্ষতি, অসাড়তা,কোমা
আর্সেনিক অর্ধপরিবাহী পদার্থের পরিবাহিতা বৃদ্ধি ডায়রিয়া, অস্বাভাবিক হৃদকম্পন, ফুসফুসের ক্যান্সার
আরসাইন রাসায়নিক বাষ্প জমা করণে মাথা ব্যাথা, দুর্বলতা, মাথা, পেটে এবং পিঠে ব্যথা, জন্ডিস, রক্তাল্পতা
( বেনজিন ) ফটো ইলেক্ট্রো কেমিক্যাল নকশার কাজে অস্থি মজ্জার ক্ষতি, রক্তাল্পতা, অত্যধিক রক্তপাত, প্রজনন প্রভাব, লিউকেমিয়া এবং কার্সিনোজেন ক্ষতি
(ক্যাডমিয়াম) ধনাত্মক চার্জ প্রভাব তৈরি করতে সিলিকন ল্যাটিসের ​​মধ্যে “গর্ত” নির্মাণ করতে ব্যবহৃত ফুসফুসের ক্ষতি,এবং ফুসফুস ও প্রস্টেট ক্যান্সার
(হাইড্রোক্লরিক এসিড) ফটো ইলেক্ট্রো কেমিক্যাল নকশার কাজে অত্যন্ত ক্ষয়কারী, গুরুতর চোখ এবং ত্বক পোড়া, নেত্রবর্ত্ম কলাপ্রদাহ,শ্বাসযন্ত্রের জ্বালা
(সিসা) রাং-ঝালাই মূত্রাশয়, প্রজনন, এবং ইমিউন সিস্টেম,অসময়ে গর্ভপাত,  , কম ওজনের শিশু, রক্তাল্পতা, ডিমেনশিয়া, মানসিক ক্ষমতা কমে যায়
মিথাইল ক্লরোফরম ধৌতকরণ মাথা ব্যাথা, চোখ, নাক, গলা, চামড়া জ্বালা, কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া
(টলুইন) রাসায়নিক বাষ্প ঘনীভবন দুর্বলতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, বমি বমি ভাব, স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি, দৃষ্টি, এবং শ্রবণ সমস্যা, পেশী নিয়ন্ত্রণ ক্ষতি, শিশুদের বৃদ্ধি ভারসাম্য নষ্ট, স্নায়ুবিক সমস্যা ও ফুসফুসের এবং যকৃত ক্যান্সার
ট্রাই ক্লরোইথাইলিন ধৌতকরণ চামড়া, চোখ, এবং শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতি, মাথা ঘোরা, চটকা, বলা এবং শুনায় বৈকল্য, কিডনি রোগ,, রক্তের সমস্যা, স্ট্রোক ডায়াবেটিস, মূত্রাশয় ক্যান্সার

এতো গেলো স্বাস্থ্যঝুকির কথা এখন পরিবেশের উপর মারাত্তক প্রভাব ফেলছে তা দেখে নেওয়া যাক-

সেমিকন্ডাক্টর দিয়ে ৬ ইঞ্চির এক একটি চিপ বানাতে শুধু ২৪০০০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ লাগছে তাই নয় আরো ২ মিলিয়ন গ্যালোন পানি প্রতিদিন খরচ হচ্ছে !!

এরচেয়েও বড় চিপ বানাতে হিসেব করেই দেখুন কি পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানির প্রয়োজন হয়! এই পানি আবার পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে প্রচুর পরিমানে রাসায়নিক পদার্থ ঢালতে হচ্ছে।

আমেরিকাতেই ৬টি রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, ইলিনয়, এবং পেনসিলভেনিয়া সেমিকন্ডাকটর কারখানা আছে। সেসব এলাকায় পানি ও বিদ্যুৎ ঘাটতিও লক্ষ্য করা যায়।

ক্যান্সার আত্মপ্রকাশ করতে ২০-২৫ বছর সময় লেগে যায় তেমনি সুদূর প্রসারী পরিবেশ দূষণের ফলাফলের জন্যে মানুষ এখনো উপলব্ধি করতে পারছে না প্রযুক্তির এই বিস্ময় আমাদের জন্য কি বার্তা নিয়ে আসছে!

তাহলে কি মানুষ ফেসবুক ,টুইটারের জগতে এসে কম্পিউটারের এমন দুর্নাম সইতে পারবে ?

নাকি এর থেকে উত্তরণের পথ আবিষ্কার করবেন বিজ্ঞানীরা?

প্রশ্ন তাহলে থেকেই যাচ্ছে……

***লেখাটি গত ১০/১১/২০১৩ তারিখে দৈনিক বর্তমানের প্রবাহ পাতায় ছাপা হয়।***

Check Also

এসেছে বাংলার ওয়াইল্ড মেন্টর

এই অ্যাপটির প্রধান উদ্দেশ্য, বিভিন্ন প্রাণির সামগ্রিক বিবৃতি উপস্থাপন। বৈজ্ঞানিক নাম থেকে শুরু করে, কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রাণির বিভিন্ন বয়সের ছবি, স্বভাব, আচরণ, আকার-আকৃতি, রঙ, খাদ্য, ইত্যাদি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যাবে এখানে খুব সহজেই। এমনকি পৃথিবীর কোথায় কোথায় এর অস্তিত্ব আছে, সেটিও ম্যাপের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে এখানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *