সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্যের সঙ্গে প্রাণ ফুডস এর মস্করা

মোহাম্মদ আরজু

কুরবানির ঈদের আগের দিন সেন্ট মার্টিন’স-এ পৌঁছেই খানিকটা বিস্মিত হতে হোলো। জেটি ও গ্যাংওয়ে জুড়ে ‘প্রাণ ফুডস লিমিটেডে’র দেয়া ‘ঈদ উৎসবে’র বিজ্ঞাপনের ঠাসাঠাসি। খেয়াল করে বোঝা গেলো ‘উৎসব’ বলে আসলে কিছু হচ্ছে না। এটি প্রাণ ফুডসে’র ‘মটর ভাজা’র বিজ্ঞাপনই মাত্র, যা কি না অপচনশীল প্লাস্টিকের প্যাকেটে বাজারজাত করা হয়; যেই প্লাস্টিক ও পলিথিন হচ্ছে এখানকার সামুদ্রিক সম্পদ ও প্রাণবৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান শত্রু।

সেন্ট মার্টিনস’র সামুদ্রিক-সম্পদ ও প্রাণবৈচিত্র্যের গুরুত্ব এবং এর প্রতি বিদ্যমান হুমকির চরম মাত্রা; এই দুই বিবেচনায় নিয়েই দেড় দশক আগে একে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘পরিবেশগতভাবে সঙ্কটাপন্ন এলাকা’ বলে ঘোষণা দেয়া হয়। এই উপলদ্ধির এত বছর পরেও আজ এখানে প্লাস্টিককে উৎসাহিত করা হচ্ছে, এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে এর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেই, এটা দুঃখজনক। আমরা মনে করি, এই বিজ্ঞাপনগুলো বসিয়ে প্রাণ ফুডস লিমিটেড খুবই আপত্তিকর কাজ করেছে।

এমনিতেই এখানে অপচনশীল বর্জ্য সরিয়ে নেয়া বা পুনঃব্যবহারযোগ্য করার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি আজও। যা করার কথা ছিল এই প্রাণ ফুডস লিমিটেড বা এর মত অন্যান্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানেরই; ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারী, ট্যুর অপারেটর, জাহাজ পরিচালনকারী প্রতিষ্ঠান ও হোটেল-রেস্তরা ব্যবসায়ীদেরই ব্যবসায়িক দায়িত্ব হচ্ছে এখানকার সামুদ্রিক সম্পদ ও প্রাণবৈচিত্র্য যাতে তাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে ব্যবস্থা করা। কিন্তু এমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় নি।pran foods st'martins island

দ্বীপটিকে একটি ‘পরিবেশগতভাবে সঙ্কটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে আমরা মনে করি কক্সবাজার জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে; অপচনশীল জিনিসপত্র এখানে যাতে যথাসম্ভব কম আসে, সেটা নিশ্চিত করা। স্থানীয় অধিবাসী ও পর্যটকদের ‘না হলেই নয়’ এমন সব জরুরি জিনিসপত্র ছাড়া বাকি অপচনশীল দ্রব্যাদির প্রবেশ এখানে বন্ধ করতে হবে। অত্যাবশ্যকীয় যেসব অপচনশীল জিনিসপত্র এখানে আসবে, সেগুলো এখান থেকে সরিয়ে নেয়া ও পুনঃব্যবহারযোগ্য করার জন্য প্লান্ট বসাতে হবে। অথচ সেরকম কোনো উদ্যোগ নেয়া ছাড়াই এখানে প্লাস্টিক-পলিথিনকে উৎসাহিত করার এমনতরো সুযোগ দেয়া প্রশাসনের খুবই ব্যর্থতা, সন্দেহ নেই।

মনে রাখতে হবে, সেন্টমার্টিনস দ্বীপ তার আপন বৈশিষ্ট্যে অনন্য। এ দ্বীপটি ঘিরে সমুদ্রে প্রবাল বসতি রয়েছে, প্রবালভিত্তিক এ জলজ বসতিটির আয়তনও অনেক বড়। সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণবাদী উদ্যোগ ‘সেভ আওয়ার সি’র তরফে সাগরে স্কুবা ডাইভিং ও জলের তলদেশের ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফি-প্রধান অনুসন্ধানে এযাবৎ দ্বীপের তিন দিকে ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রচুর প্রবাল দেখেছি আমরা। ওখানে কমপক্ষে ৬৫টি প্রজাতির প্রবাল ও ৪৬টি প্রজাতির শৈবাল শনাক্ত করা গেছে।

এই প্রবাল ও শৈবাল ভিত্তিক জলজ বাস্তুসংস্থান বাংলাদেশের জলবায়ু ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অতুলনীয় ভূমিকা রেখে আসছে। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের জন্যও এই বাস্তুসংস্থানের যেই ভূমিকা তা সমুদ্রের আর কোনো বাস্তুসংস্থানের সঙ্গে তুলনা করা চলে না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কমবেশি প্রায় দুইশ প্রজাতির মাছ এই বাস্তুসংস্থানের ওপর কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল।

এখানে দেশের আর দশটা এলাকার মত দায়িত্বহীন পর্যটন চালানোর পরিণতি খুবই দুঃখজনক ও ক্ষতিকর হচ্ছে। ‘ইকো-ট্যুরিজমের নাম করে সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের আর সব পর্যটন স্থানের মতোই হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁ করে ভরে ফেলা হয়েছে দ্বীপটিকে। এক্ষেত্রে কোনো পরিবেশগত বা টেকসই চিন্তাধারা ছিল না। যেখানে আগে বিরল সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার জায়গা ছিল, সেখানেই পাথর তুলে ঘেরা দিয়ে পর্যটকের চেয়ার বসাল হোটেল মালিকরা। যেখানে দুটো মাছ ধরে জীবিকা চালাত স্থানীয়রা, সেখানে বড় জাহাজগুলোর প্রপেলারে উঠে আসা পলি, আর পর্যটকদের আচরণ ও পর্যটন স্থাপনাগুলোর দূষণের প্রভাবে প্রবাল-বসতি প্রায় নির্বংশ, মাছও উধাও।

এই পরিস্থিতি দ্রুত বন্ধ না করলে প্রবাল বসতিটির যেই ধ্বংসাবশেষ এখনো কোনোমতে টিকে রয়েছে তাও থাকবে না। আর এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের দায়িত্ব যাতে এখানে পর্যটন ব্যবসারত প্রতিষ্ঠানগুলোই নেয়, সেই ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। এর থেকে উত্তরণের পথে সরকারের প্রথম পদক্ষেপগুলোর একটি হতে পারে; এই প্লাস্টিকের প্যাকেটের মত পরিবেশ বিধ্বংসী জিনিসপত্র-বিষয়াশয়কে উৎসাহিত না করা।

অপচনশীল জিনিসপত্র সরিয়ে আনা বা পুনঃব্যবহারযোগ্য করবার ব্যবস্থা করতে হবে। জলজ পরিবেশ ও প্রাণের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এসব বর্জ্য সাগরে ফেলা বন্ধ করতে হবে। আবাসিক হোটেলগুলো থেকে মনুষ্য বর্জ্য, ক্ষতিকর রাসায়নিক, কীটনাশক, সাবান, ডিটারজেন্ট ও ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদি সরাসরি সাগরজলে নিষ্কাষণ করা যাবে না; পরিশোধন করার ব্যবস্থা করতে হবে। এসব রাসায়নিকের কারণে ব্লিচিংয়ের শিকার হয়ে প্রবাল মারা পড়ছে।

এখানে সামুদ্রিক পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হচ্ছে প্রবাল। একে কেন্দ্র করে সামুদ্রিক পরিবেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ আবর্তিত হয়। স্থলভাগে মানুষের জীবনমান যেমন সাগরের ওপর নির্ভরশীল, তেমনি পৃথিবীর বিপুল মহাসাগরের সুস্বাস্থ্য অনেকাংশেই নির্ভর করে প্রবাল এর ওপর। পৃথিবীর বিপুল মহাসাগরের ১ শতাংশেরও কম অঞ্চলে রয়েছে এই প্রবালের বসতি। দুই লক্ষ বায়াত্তর হাজার বর্গকিলোমিটারের বঙ্গোপসাগরেও প্রবাল রয়েছে অল্প কিছু জায়গায়। সাগরে এরা কমপক্ষে ২৫ শতাংশ প্রাণের খাবার ও বসতি যোগায়, সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পর্যটন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বহীনতার কারণে আমরা এই প্রবাল বসতি নষ্ট হতে দিতে পারি না। অভিজ্ঞতা থেকে বলা চলে, অনেকেই আছেন যারা তাদের ব্যবসায়ের পরিবেশগত দায় নিতে চান, দায়িত্ব পালন করতে চান। সরকারের কাজ হবে, প্রথমে এদের নিয়ে উদ্যোগ শুরু করা। এই দায়িত্বশীল ব্যবসায়ীরা যাতে সেন্ট মার্টিনসের পর্যটনকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই রুপ দিতে পারেন, সেই লক্ষ্যে প্রাথমিক আয়োজনের কাজটা সরকারকেই করতে হবে।

মোহাম্মদ আরজু: প্রধান নির্বাহী, সেভ আওয়ার সি। arju@saveoursea.social

Check Also

জলবায়ু পরিবর্তনঃ যে ৯ টি কারণে ২০১৮ তে আমরা আশাবাদি হতেই পারি!

সাদিয়া লেনা আলফি গেল বছরটি ছিলো জলবায়ুর জন্য বেশ আশঙ্কাজনক। বিষয়টি মূলত ঘটেছে বর্তমান বিশ্বের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *