জলে-জঙ্গলে তেল-কয়লা বন্ধে যা করার

মোহাম্মদ আরজু

বনের মাঝখান দিয়ে তেল নিয়ে জাহাজের যাবার কথা ছিল না। কিন্তু যাচ্ছিল প্রতিদিনই। আইন ও স্বাভাবিক কান্ডজ্ঞানের থোড়াই কেয়ার করে চলছিল বনমধ্যে জাহাজ বহর। এই একদিন ডুবলো। পোড়া-কপালি সুন্দরবনের কপাল ফের পুড়লো। তেল যতই সাফ করা হোক না কেন, তেলে আর জলে মেশে না’র প্রবাদটি পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত, এইটেই পরম দুঃখের কারণ।

এই তেলের কারণে এখন জলে-জঙ্গলের প্রাণেরা মারা পড়বে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অসুস্থতা বয়ে বেড়াবে অনেক প্রাণ, তেল-সংক্রমিত পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থা প্রাণ ধারণের অনুপযোগী হয়ে থাকবে বছরের পর বছর ধরে। জলে-জঙ্গলে যাদের জীবিকা, তারা আরও বেশি মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হবে।

আমি মাঝে মধ্যে ভাবি, এই যে একের পর এক এভাবে প্রতিবেশগত বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে দেশ জুড়ে, একে ঠেকাতে যদি কেউ চায়ই, যেমন ধরুন রাষ্ট্র নিজেই, তবে সেই ঠেকাতে চাওয়ার পেছনে খুশি থাকবার মত যুক্তির কি অভাব পড়েছে রাষ্ট্রের? প্রতিবেশগত ক্ষতির কারণে তার নাগরিকের জীবন যে ক্রমশ মানবেতর হয়ে পড়ছে, সেই কারণটুকুও সুরক্ষামূলক প্রচেষ্টা শুরুর পেছনে যথেষ্ট নয় কেনও?

পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে টের পাই, পরিবেশের ভারসাম্য আর মানুষের উন্নত জীবনের জড়াজড়ি সম্পর্কটুকু এখনও মেনে নিতে পারেনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। হয়তো আইন লঙ্ঘন করে সুন্দরবনের মাঝখান দিয়ে জাহাজ চলাচলের ব্যাপারে চুপ থাকার সময় এমনই ন্যায্যতা ছিল সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। হয়ত ‘ষোলো কোটি মানুষকে খাওয়াতে হবে না?’ এমন ন্যায্যতামূলক প্রশ্নের আড়ালেই কাজটি হয়েছে।

গার্ডিয়ানস অফ দা কোস্ট ছবিঃ মোহাম্মদ আরজু
গার্ডিয়ানস অফ দা কোস্ট ছবিঃ মোহাম্মদ আরজু

জলের থেকে, জঙ্গলের থেকে যে প্রাকৃতিক সম্পদ ও সেবা আসে; তা ছাড়া যে মানুষের উন্নত জীবন হতে পারে না, এর বাইরে যে সুস্থ জীবন নাই, অর্থনীতির উন্নতি নাই, স্বাস্থ্যকর সমাজের গতি নাই, সেইটে বুঝতে হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। কাজেই, অর্থনীতির দোহাই দিয়ে এমন ধারা পরিবেশগত ঝুঁকি নেওয়ার ন্যায্যতা দেখালে চলবে না। বরং এখনকার অর্থনৈতিক তৎপরতার মূলমন্ত্রই হচ্ছে প্রাণ ও প্রতিবেশকে সুরক্ষিত রাখা, যাতে করে জীবনমানের উন্নতি সম্ভব হয়।

আগামী বছরের থেকে জাতিসংঘেরও সহ্রসাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) আর নাই। শুরু হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)। দুনিয়া জুড়ে অর্থনৈতিক তৎপরতাকে টেকসই করবার ওপরই এর জোর। টেকসই অর্থনীতির সোজা মানে তো জাতীয় পরিসরে ইতোমধ্যে জানা; অর্থনৈতিক তৎপরতা এমনভাবে চালানো যাতে প্রাণ ও প্রতিবেশের ওপর এর কুপ্রভাব না পড়ে, কারণ যদি প্রাণ ও প্রতিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে কোনো অর্থনৈতিক উন্নতিই স্থায়ী হবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চরমভাবাপন্ন জলবায়ু এবং বিরুপ পরিবেশ সবকিছুরে নাই করে দেবে ক্রমাগত।

জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশল, ২০১৫-২০২০ গ্রহণ করেছে। অর্থনীতিকে এই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও বৈষয়িক সামর্থ্য তৈরিতে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। বাংলাদেশে বন ও বণ্যপ্রাণীর ক্ষেত্রে বলা যায়, বন বিভাগ এই দিকে খেয়াল দিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। ইতিহাস এর সাক্ষী।

বনজসম্পদের আহরণের ব্যবস্থা করে দিয়ে রাজস্ব আদায়ের সংস্থা হিসেবে যেই বন বিভাগের যাত্রা, তারও কিছু ভিন্ন আয়োজন ছিল; আহরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার ব্যবস্থাপনা থাকা। সেইটুকুও গত কয়েক দশকে হারিয়েছে, বনের ক্রমশ বিনাশের মুখে বন বিভাগের যেন কোনোই দায় নাই। এমনটাই মনে হয় সারা দেশে বনের অবস্থা দেখলে।

আমরা মনে করি, টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশের যে প্রতিশ্রুতি, তার বাস্তবায়নে বন বিভাগের ব্যাপারে নতুন চিন্তা দরকার। বাংলাদেশে বন ও পরিবেশের যে হাল এখন, তাতে করে একে আর রাজস্ব আদায়ের সংস্থা হিসেবে ধরে রাখলে চলছে না। এতো ক্ষয়ক্ষতির ভার এই দেশের নাজুক পরিবেশ ও কোটি মানুষের জীবনের জন্য বড় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। বন বিভাগের খোলনলচে পাল্টে দেওয়া দরকার, নয়তো নবরূপে পরিবেশ সংস্থা দরকার, জাতীয়ভাবে। যে সংস্থাকে টেকসই অর্থনীতির লক্ষ্যে পরিবেশের সুরক্ষাকেই প্রধান কাজ দিতে হবে।

বাংলাদেশে এযাবত যদ্দুর সম্ভব কার্যকর রাষ্ট্রীয় পরিবেশ সংস্থা- পরিবেশ অধিতফতরের নেতৃত্বে এটি শুরু করা যেতে পারে। পরিবেশ অধিদফতরকে একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় পরিবেশ সংস্থা হিসেবে রূপ দেওয়া জরুরি। বছরের পর বছর ধরে এটি হয়নি। এখন এই প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা দরকার। গবেষণা, ব্যবস্থাপনা ও আইন প্রয়োগে পরিবেশ অধিদফতরকে নিযুক্ত করা দরকার। সেই লক্ষ্যে দরকারি নীতিগত ও অবকাঠামো সংস্কার জরুরি।

জলজ পরিবেশের দূষণের ক্ষেত্রে উদ্বেগের নতুন প্রদেশ এখন যুক্ত হয়েছে, বাংলাদেশের সমুদ্র প্রদেশ বিষয়ে প্রতিবেশি দুই দেশের সঙ্গে সীমানা নিষ্পত্তির পর। আমাদের জ্বালানির প্রায় সবটুকু আসছে জীবাশ্ম জ্বালানির থেকে। ভোক্তা মানুষের জীবন উপভোগের অস্বাস্থ্যকর ধরণের কারণে ক্রমশ বাড়ছে জ্বালানির চাহিদা। ক্রমশ বাড়তে থাকা জ্বালানির চাহিদা মেটাতে এবার বঙ্গোপসাগর তলের ভূগর্ভে খোড়াখুড়ির কাজ শুরু হবে।

আমাদের এখানে আবহাওয়া, মানে জল আর বাতাসের মতি-গতি-প্রকৃতি কেমন হবে তার প্রায় সবটুকুই ঠিক করে দেয় বঙ্গোপসাগর। এই সাগরকে নানা তেল-গ্যাস ব্লকে ভাগ করে অনুসন্ধান শুরু করছে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারত। বিপুল প্রাণবৈচিত্রময়, স্পর্শকাতর অপার বৈচিত্রের এই জলজীবনের মধ‌্যে যখন তেল ও গ্যাসের সন্ধানে খোড়াখুড়ি শুরু হবে, তখন এতে জরুরিভাবে পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ চালু রাখতে হবে; যাতে বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটে না যায়।

উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিকট অতীতে প্রায়ই দেখা গেছে- যথাযথ পরিকল্পনা, দূষণ ও দুর্ঘটনা রোধে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর (আইওসি) সচেতনতার অভাব, নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বহীনতার ফলে জলজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে।

মোহাম্মদ আরজু: প্রধান নির্বাহী, সেভ আওয়ার সি। arju@saveoursea.social

Check Also

জলবায়ু পরিবর্তনঃ যে ৯ টি কারণে ২০১৮ তে আমরা আশাবাদি হতেই পারি!

সাদিয়া লেনা আলফি গেল বছরটি ছিলো জলবায়ুর জন্য বেশ আশঙ্কাজনক। বিষয়টি মূলত ঘটেছে বর্তমান বিশ্বের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *