সুন্দরবনে তেলের ট্যাঙ্কারডুবি, পরিবেশের উপর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও করণীয়

মোস্তফা কামাল পলাশ

সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে গত মঙ্গলবারে সংঘটিত দুর্ঘটনা কবলিত তেলবাহী জাহাজ হতে যে জ্বালানি তেল নদীতে ছড়িয়ে পড়েছে সেটি হলো ফার্নেস তেল। ফার্নেস তেল  হলো কম সান্দ্রতা (viscosity) সম্পন্ন এক প্রকার পেট্রো ক্যমিকেল পদার্থ যা সাধারণত শিল্প কারখানার বয়লার ও বাসা-বাড়ি গরম রাখার জ্বালানি হিসাবে শীত প্রধান দেশে ব্যাপক ভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে।

অন্যান্য জ্বালানি তেল দুর্ঘটনা অপেক্ষা ফার্নেস তেল দুর্ঘটনার একটা কম ক্ষতিকর দিক হল এই তেল সহজে (অন্যান্য জ্বালানি তেল অপেক্ষা) পরিষ্কার করা যায়; কিন্তু বেশী ক্ষতিকর দিক হলো এই তেল খুব দ্রুত দুর্ঘটনা কবলিত এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে যা আজকের দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা বন বিভাগের উদ্ধৃতি দিয়ে নিশ্চিত করেছেন “বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সুন্দরবনের পশুর, শ্যালা, রূপসা ও বলেশ্বর নদের ৮০ কিলোমিটার এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়েছে”।lizard affected by oil

তেল ও পানি উভই তরল পদার্থ হলেও বেশি ভাগ তেল (দুই এক প্রকার ছাড়া) পানি অপেক্ষা হাল্কা হওয়ায় তা পানির সাথে না মিশে পানির উপরে ভাসতে থাকে। কোন দুর্ঘটনার ফলে যদি তেল নদী কিংবা সমুদ্রের পানিতে ছড়িয়ে পরে তার বিস্তৃতি নির্ভর করে বাতাস প্রবাহের দিক, বাতাসের গতি, জোয়ার-ভাটার সক্রিয়তা ইত্যাদির উপর। তেল যেহেতু একটি রাসায়নিক পদার্থ তাই পরিবেশ এর উপর এর ক্ষতিকর প্রভাব থাকাই স্বাবাভিক। উপকূলীয় এলাকার নদী ও জলাভূমিকে উদ্ভিদ ও প্রাণীর নার্সারি বলা হয়ে থাকে। সুন্দরবন এর যে স্থানে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে সেই এলাকার পরিবেশের বিভিন্ন উপদানগুলোর উপর নিম্নোক্ত ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যেতে পারে:

নদীস্থ ও নদী সংলগ্ন এলাকার উদ্ভিদের উপর ক্ষতিকর প্রভাব:

বিভিন্ন সংবাদ পত্রের মাধ্যমে ইতিমধ্যে জেনেছেন যে এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটি সুন্দরবন এলাকার একটি নদী। নদীর দুই পাশে যে বন সেটি শ্বাসমূলীয় (ম্যানগ্রোভ) বনাঞ্চল যা সাধারণত সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার দেখা যায়। সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। পানিতে ভাসমান তেল কণা ম্যানগ্রোভ বনের স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে। ম্যানগ্রোভ বনের উদ্ভিদগুলো সুমদ্রের জোয়ার-ভাটা পরিবেশে অভিযোজিত ও মাটির উপরে উঠে আসা মুলে লেনটিসেল নামক এক প্রকার ক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে যার মাধ্যমে বায়ু থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করে থাকে। প্রচণ্ড সর্দিতে আক্রান্ত হলে মানুষের নাক যেমন বন্ধ হয়ে যায় ঠিক একই ভাবে জোয়ার-ভাটার সময় পানির ঢেউ এর মাধ্যমে দুর্ঘটনার ফলে ছড়িয়ে পড়া তেল মাটির উপরে উঠে আসা শ্বাসমূলীয় বৃক্ষের মুলে জড়িয়ে লেনটিসেল নামক ছিদ্র বন্ধ করে দেয়। নিঃশ্বাস বন্ধ হলে যেমন মানুষ মারা যেতে বাধ্য একই ভাবে দুর্ঘটনা কবলিত স্থানের বনাঞ্চলের শ্বাসমূলীয় বৃক্ষের লেনটিসেল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে অক্সিজেনের অভাবে আগামী কিছু দিনের মধ্যে মারা যেতে থাকলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। United States Environmental Protection Agency (U.S. EPA) রিপোর্ট অনুসারে কোন-কোন ক্ষেত্রে এক দশকেরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে [সূত্র ১]। কিছু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল আর কক্ষনই পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায় নি [সূত্র ২]। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার নদীর দুই পাশে রিপেরিয়ান এলাকায় যে বৃক্ষ রয়েছে জোয়ার-ভাটার ফলে তেল সেই সকল বৃক্ষের পাতা ও কাণ্ডে জড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে এখন যেহেতু বৃষ্টি হবেনা তাই উক্ত তেল পুর-পুরি ধুইয়ে যেতে অন্তত ২-৩ সপ্তাহ লেগে যাবে। অর্থাৎ দুর্ঘটনা কবলিত স্থান হতে ভাটি অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণী আগামী ২-৩ সপ্তাহ ধরে এই দূষণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে [সূত্র ৩]। নদীর দুই কূলবর্তী এলাকার মাটি কর্দমাক্ত ও পচা লতা-গুল্ম যুক্ত হওয়ায় নিঃসৃত তেলের একটি অংশ মাটির সাথে লেগে থাকবে [সূত্র ৩]। সূর্য রশ্মি পানির আভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবে না ফলে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন নামক ক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া বাঁধা গ্রস্ত হবে।

 Sundarban river oil spillage

নদীস্থ ও নদী সংলগ্ন এলাকার প্রাণী সম্পদের উপর সম্ভব্য ক্ষতিকর প্রভাব:

দুর্ঘটনার ফলে ছড়িয়ে পড়া তেল নদী ও নদীর দুই পার্শ্বে বসবাসকারী প্রাণী সম্পদ যেমন: মাছ, ছোট মাছের প্রধান খাদ্য প্ল্যাঙ্কটন, মাছের উপর নির্ভরশীল পাখী, ভোঁদড় ইত্যাদি প্রাণীর উপর ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। কাপড় যেমন শীত ও গ্রীষ্মের তাপ থেকে মানুষের মানুষর শরীরকে রক্ষা করে একই ভাবে পাখী জাতীয় প্রাণীর পাখনা তাদের শরীরকে তাপ নিরোধক আবরণ দেয়। এখন যেহেতু শীত কাল শুরু হয়ে গিয়েছে তাই পাখির শরীরে তেল জড়িয়ে যাওয়ার কারণে হাইপোথারমিয়া হয়ে মারা যাবে। দুর্ঘটনার ফলে ছড়িয়ে পড়া তেল, মাছের উপর নির্ভরশীল পাখী যেমন: মাছ রাঙ্গা, পান কৌড়ি সহ বিভিন্ন প্রকার বকের পাখনায় জড়ালে ডানা ভারী হয়ে সেই পাখি উড়ানোর শক্তি হারাবে [সূত্র ৬]। ফলে সহজেই অন্য প্রাণী দাঁরা আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাবে। ভোঁদড়; বাঘ, বাণর ইত্যাদি প্রাণীর গায়ে তেল জড়ালে সেই প্রাণী গুলো নিজের জিভ দিয়ে তা পরিষ্কার করার চেষ্টা করবে; এর ফলে তেলের একটা অংশ পেটের ভিতরে চলে যাবে ও বিষক্রিয়ার আক্রান্ত হবে। বেশি পরিমাণ তেল পেটে প্রবেশ করলে মৃত্যু অনিবার্য। একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে তেল দুর্ঘটনা সংঘটিত এলাকার প্রাণী সম্পদের প্রজনন ক্ষমতা শতকরা ৩০ থেকে ৬০ ভাগ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে ও পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে ৩ থেকে ৫ বছর লেগেছে। আলাস্কা উপকূলে সংঘটিত তেল দুর্ঘটনার পরে ৩০ হাজার মৃত পাখি পাওয়া গিয়েছিল। প্রকৃত সংখ্যা প্রাপ্ত মৃত পাখি চেয়ে পাঁচ গুনেরও বেশী বলে বৈজ্ঞানিকরা মনেকরে। চূড়ান্ত ফলাফল সুন্দরবনের ঐ এলাকা হারাবে জীব বৈচিত্র্য।

 oil spillage in shela

নদীর মৎস্য সম্পদের উপর সম্ভব্য ক্ষতিকর প্রভাব:

দুর্ঘটনার ফলে নদীর পানিতে ছড়িয়ে পড়া তেল পানির উপর পাতলা একটি আস্তর তৈরি করবে যা ভেদ করে সূর্য রশ্নি পানির আভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবে না ফলে জুয়ো প্ল্যাঙ্কটন নামক ক্ষুদ্র প্রাণীর প্রধান খাদ্য ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন নামক ক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া বাঁধা গ্রস্ত হবে। ফলে জুয়ো প্ল্যাঙ্কটন হলো ছোট মাছের প্রধান খাদ্য। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের অভাবে জুয়ো প্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ কমে যাবে; জুয়ো প্ল্যাঙ্কটনের অভাবে ছোট মাছের সংখ্যা কমে যাবে; ছোট মাছের অভাবে ঐ এলাকার বড় মাছ ও ডলফিনের খাদ্য সংকট দেখা দেবে। পানির উপরস্থ তেলের স্তর ভেদ করে বাতাসের অক্সিজেন পানিতে দ্রবীভূত হতে পারবে না ফলে নদীর তলদেশে অক্সিজেন শূন্য অবস্থার সৃষ্টি হবে ও কাদায় বসবাস কারি প্রাণী মারা যেতে পারে। চূড়ান্ত ফলাফল সুন্দরবনের ঐ এলাকার নদী গুলো হারাবে জীব বৈচিত্র্য।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের উপর সম্ভব্য অর্থনৈতিক প্রভাব:

সুন্দরবন এলাকার মানুষের অন্যতম প্রধান জীবিকা হলো বন হতে মধু সংগ্রহ ও নদী থেকে মৎস্য সম্পদ আহরণ। আমরা ইতি মধ্যে জেনেছি যে দুর্ঘটনার ফলে নদীর পানিতে ছড়িয়ে পড়া তেলের কারণে ঐ এলাকার নদী ও বনের বাস্তু সংস্থানের ব্যাপক ক্ষতি হবে যার সরাসরি প্রভাব পরবে মৎস্য ও বনজ সম্পদের উপর অর্থনৈতিক ভাবে নির্ভরশীল মানুষের উপর।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পর্যটন শিল্পের উপর সম্ভব্য প্রভাব:

দেশ ও বিদেশের মানুষের কাছে বাংলাদেশের দুইটি প্রধান পর্যটন স্থান হলো কক্সবাজার ও সুন্দরবন। কক্সবাজার এর চেয়ে সুন্দর সমুদ্র সৈকত বিশ্বের অনেক দেশে থাকলেও সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন নাই; ম্যানগ্রোভ বন থাকলেও ডোরা কাঁটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার নাই। ঐ এলাকার যে ছবি গুলো নেটে দেখা যাচ্ছে তাতে নিশ্তিচ করেই বলা যায় যে বাঘ মামা ভুল করেও ঐ এলাকার নদীর পাশে পা মোড়াবেন না পানি খেতে; যদি না সেই মামা কানা হয়ে থাকেন অথবা বাঘ শিকারির তাড়া না খেয়ে থাকেন।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যের উপর সম্ভব্য প্রভাব:

আজকের বিভিন্ন পত্রিকা পড়ে জানতে পারলাম যে আগামী ২-৩ দিন স্পঞ্জ দিয়ে ঐ এলাকার মানুষের (দারিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ) মাধ্যমে নিঃসৃত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করা হবে। আমি অনুরোধ করতে চাই সরকার যেন ঐ মানুষ গুলোর জন্য রাবারের হাতমোজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। আমেরিকার নর্থ ডেকটা বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রকৌশলী কেন হেলিভান বলেন “The vapors from fuel oil spills or leaks are extremely penetrating and volatile,” says Ken Hellevang, North Dakota State University Extension Service agricultural engineer. “Hiring a professional spill response company to remove the fuel oil is your best option.”

 sundarban village people removing oil

অতিরিক্ত পরিমাণে তেলের বাষ্পের-স্পর্শে আসলে মানুষের বমি-বমি ভাব, অতিরিক্ত রক্ত চাপ, চোখ জ্বালা, মাথা ব্যথা, ও মাথা ঘোরা দেখা যেতে পারে। পত্রিকা পড়ে আরও জানতে পারলাম যে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পদ্মা বলেছে তারা সংগৃহীত তেল কিনে নেবেন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। টাকার লোভে পড়ে বয়স্ক ও যুবক মানুষ বিশেষ করে যারা হাঁপানি ও পরিপাক তন্ত্রের সমস্যায় ভুগিতেছেন তারা যদি তেল সংগ্রহের নেমে পড়েন ও বেশি সময় ধরে তেলের বাষ্পের-স্পর্শে আসেন তবে তাদের ঐ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে। তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ করতে চাই তেল অপসারণে নিয়োজিত মানুষ গুলোর জন্য একটি আস্থায়ী মেডিক্যাল টিমের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন।

 oil in sundarbans

যেভাবে তেল অপসারণ করা যাতে পারে:

খুব সহজ ও সফল আদিম প্রযুক্তির মাধ্যমে দূষণ কমানো ও তেল অপসারণ

১) জোয়ার-ভাটার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার নদীর দুই কূলের রিপেরিয়ান এলাকায় বৃক্ষের পাতা ও কাণ্ডে তেল জড়িয়ে গেছে তা কেটে ফেলা। বছরের এই সময় এমনিতেই গাছের পাতা ঝড়ে যায় তাই এই উপার খুবই কার্যকর হতে পারে।

২) কোন প্রাণী কিংবা পাখী তার গায়ে তেল লেগে থাকলে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলা খুবই কার্যকরী উপায়।

৩) ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটির চার পাশে বেলুনের মতো প্লাস্টিক এর ফোলান পাইপ স্থাপন করে জাহাজে রক্ষিত অবশিষ্ট তেলের নদীর পানিয়ে চুইয়ে পড়া রোধ করা।

৪) তেল ইতিমধ্যে যে এলাকায় পৌঁছেছে তার ভাটিতে একই ভাবে বেলুনের মতো বাতাস দিয়ে প্লাস্টিক এর ফোলান পাইপ স্থাপন করা যেতে পারে যাতে করে নতুন এলাকায় তেল ছড়িয়ে না পড়তে পারে।

যান্ত্রিক উপায়ে তেল অপসারন

৫) ফোলানো সে পাইপের ঠিক পিছনেই সাধান নৌকা (যন্ত্র চালিত না; যন্ত্র চালিত নৌকা পানিতে ঢেউ এর সৃষ্টি করে তেল যমতে বাঁধা দিবে) নিয়ে অবস্থান করে পাইপে আটকে পড়া তেল স্পঞ্জ দ্বারা সংগ্রহ করা।

oil remover pipe

জৈব প্রযুক্তির (Bioremediation) মাধ্যমে নিঃসৃত তেল পরিশোধন/অপসারণ

৬) Bioremediation (জীবাণু-বিয়োজ্য) প্রযুক্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রাসায়নিক সার যেমন নাইট্রোজেন, ফসফরাস ছিটিয়ে দুর্ঘটনা কবলিত স্থানের মাটিতে ইতিমধ্যেই অবস্থিত মাইক্রো অরগানিজম (যেমন: তেল খেকো ব্যাকটেরিয়া) এর স্বাভাবিক কার্যক্রমের হার ব্রদ্ধি করে (সহজ কথায় বেশি মাংস জন্য যেমন গরু-ছাগল মোটা তাজা করন প্রকল্প নেওয়া হয়ে থাকে ঠিক তেমন) তেলের অণুর ভাঙ্গন প্রক্রিয়া দ্রুত করা যায় (তেলের অণুকে ভেঙ্গে রাসায়নিক ভাবে নিষ্ক্রিয় পদার্থে পরিণত করা)। তেল খেকো ব্যাকটেরিয়া কিভাবে কাজ করে তার সুন্দর বর্ণনা পাওয়া যায় আমেরিকান মাইক্রোবায়োলজি সোসাইটি প্রকাশিত ছোট একটি রিপোর্টে [সূত্র ৮]। জৈব প্রযুক্তির একটি সুবিধা হল এটি অর্থনৈতিক ভাবে সাশ্রয়ী ও কাজ শেষে পরিবেশের উপর অপেক্ষাকৃত কম অবশিষ্টাংশ (Residue) রাখে। বহুল প্রচলিত জৈব উত্তেজক রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পটাশিয়াম নাইট্রেট (KNO3), সোডিয়াম নাইট্রেট (NaNO3), এমুনিয়াম নাইট্রেট (NH4NO3), সোডিয়াম বাই ফসফেট (K2HPO4) ইত্যাদি [সূত্র ৫]। এই প্রযুক্তির সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে কোন পরিবেশে তেল দুর্ঘটনা ঘটেছে (মুক্ত জলাশয়ে নাকি বদ্ধ জলাশয়ে) [U.S. EPA’s definition of Bioremediation: “the act of adding materials to the act of adding materials to contaminated environments to cause an contaminated environments to cause an acceleration of the natural biodegradation acceleration of the natural biodegradation processes”. U.S. EPA has defined bioremediation agents as U.S. EPA has defined bioremediation agents as “microbiological cultures, enzyme additives, or microbiological cultures, enzyme additives, or nutrient additives that significantly increase the nutrient additives that significantly increase the rate of biodegradation to mitigate the effects of rate of biodegradation to mitigate the effects of the [oil] discharge”]

রাসায়নিক উপায়ে তেল পরিশোধন/অপসারণ

৭) সব শেষে রাসায়নিক পদার্থ ছিটিয়ে অবশিষ্ট তেলের কণা গুলোকে ভেঙ্গে রাসায়নিক ভাবে কম সক্রিয় পদার্থে পরিণত করা যেতে পারে।

নিয়ন্ত্রিত আগুণের মাধ্যমে তেল অপসারণ

৮) নদীর পানিতে ভাসমান তেল বুম (ফ্লটার) দিয়ে এক জায়গায় জড়ো করে নিয়ন্ত্রিত ভাবে জ্বালিয়ে দেওয়া যেতে পারি। তবে তা করতে হবে অবশ্যই প্রশিক্ষিত অগ্নি নির্বাপক কর্মী (ফায়ার ব্রিগেড) এর মাধ্যমে। যদিও এই উপায়ে বায়ু দূষণ হবে কিছুটা।

উপরে উল্লেখিত পদ্ধতিগুলো ছাড়াও আমেরিকার পরিবেশ রক্ষা অধিদপ্তর (U.S. EPA’s) তেল দুর্ঘটনার মোকাবেলা করার জন্য বেশ কিছু পদ্ধতি প্রস্তাব করেছেন যার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় তাদের ওয়েবসাইটে [সূত্র ৭]।

সর্বোপরি বাংলাদেশ সরকার আমেরিকান সরকারের সহযোগিতা চাইতে পারে কারণ তারা ২০১০ সালে মেক্সিকো উপসাগর তেল দুর্ঘটনার পরে তা সরিয়ে ফেলে বিশ্বের যে কোন দেশের চেয়ে অনেক অবিজ্ঞতা অর্জন করেছে। অথবা জাতিসংঘের সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে যেহেতু বাংলাদেশ সরকারের এত বেশি পরিমাণ তেল (প্রায় সাড়ে ৩ লাখ লিটার) দুর্ঘটনা মোকাবেলা করার অবিজ্ঞতা নাই। মনে রাখতে হবে নিঃসৃত তেল যত দ্রুত অপসারণ করা সম্ভব হবে পরিবেশের ক্ষতির পরিমাণ ততই কম হবে।

ছড়িয়ে পড়া তেল অপসারণ কালে অবশ্য পালনীয় সতর্কতা:

জ্বালানি তেল যেহেতু দাহ্য পদার্থ তাই নিঃসৃত তেল সংগ্রহের সময় নিম্নোক্ত সতর্কতা গুলো অবশ্যই পালন করতে হবে:

১) তেল নিঃসৃত এলাকায় কোন প্রকার ধূমপান করা যাবে না

২) কেউ ধূমপান করলে বিড়ি কিংবা সিগারেটের শেষ অংশ নিচে ফেলে জুতা দিয়ে নিভিয়ে ফেলতে হবে।

৩) মোমবাতি জ্বালানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

৪) আগামী ৭-১০ দিন ঐ এলাকায় মধু সংগ্রহের জন্য যেন কোন বাওয়ালি যেতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বাওয়ালীরা আগুন দিয়ে মৌমাছি তাড়িয়ে মধু সংগ্রহ করে।

৫) স্পার্ক করে এমন কোন বৈদ্যুতিক যন্ত্র পাতি ব্যাবহার করা থেকে যথা সম্ভব বিরত থাকার চেষ্টা করা যত খন পর্যন্ত না নিঃসৃত তেলের একটা বড় অংশ সংগ্রহ করা হচ্ছে।

আমেরিকার মতো দেশ ক্যালিফোর্নিয়ার বনাঞ্চলের আগুন নেভাতে হিম-সিম খেয়ে যায় হাজার-হাজার অগ্নি নির্বাপক কর্মী, গাড়ি ও হেলিকপ্টার থাকার পরেও। অবহেলার কারণে একবার যদি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আগুন লেগে যায় তবে চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে সুন্দরবন।

সরকারের ভবিষ্যৎ করণীয়:

পত্রিকার মাধ্যমে জেনে অবাক হলাম যে তাদের কাছে ছড়িয়ে পড়া তেল সংগ্রহ করার কোন যন্ত্র পাতি নাই। কার কাছে আছে সেটাও নিশ্চিত করে বলতে পারে না; সন্দেহ করতেছ নৌ বাহিনীর কাছে আছে। দারিদ্র্যতার কারণে ১০ টাকার টিকেট না কেটে ট্রেন উঠার জন্য ২ দিনের কারাবাস করতে হলেও কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি করার পড়েও আইনের হাত পৌছবে না দুর্ঘটনার জন্য অভিযুক্ত মানুষ গুলোর ঘাড়ে; এক দিনের জন্যও জেলে যেতে হবে না কাউকে; হয়তো জেলে গেলেও তাজরিন গার্মেন্টস এর মালিকের মতোই কিছু খেটে খাওয়া মানুষ কে জিম্মি করে জেল থেকে বেড় হয়ে আসবে কয়েক দিনের মধ্যে।

বরাবরের মতো এবারও সরকারি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে; যে কমিটির বেশিভাগ সদস্যের পরিবেশ বিষয়ে কোন জ্ঞান নাই। বরাবরের মতো এবারও নিশ্চিত করেই বলা যায় দুর্ঘটনার উপযুক্ত কারণ জানা যাবে না পূর্বের ঘটনাগুলোর মতোই। ঘটে যাওয়া ভুল কিংবা অপরাধ স্বীকার করে নিলে একই ভুল কিংবা অপরাধ ঘটার সম্ভাবনা কমে যায়। বিপরীত ঘটনা ঘটে যদি ঘটে যাওয়া ভুল কিংবা অপরাধ অস্বীকার করা হয়। দুর্ভাগ্য ক্রমে বাংলাদেশের বেশিভাগ মানুষ ও সরকার ভুল ও অপরাধ অস্বীকার করে প্রায় সবসময়ই। ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা মানুষকে সুযোগ দেয় টা থেকে শিক্ষা নেওয়ার; আশাকরি বাংলাদেশ সরকারও এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দুর্ঘটনা মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে রাখবেন। তবে সরকারের উচিত দুর্ঘটনা যেন না ঘটে সেই ব্যবস্থা নেওয়া।

দেশের পরিবেশ ও অর্থনীতি গবেষকদের প্রতি অনুরোধ:

দুর্ঘটনা কবলিত স্থান যেহেতু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খুব বেশি দূরে না তাই পরিবেশ বিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসাবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক দের অনুরোধ করতে চাই দুর্ঘটনা কবলিত স্থানের নদী ও বনের বাস্তু সংস্থান পর্যবেক্ষণ করুণ। একজন পরিবেশ গবেষকের জন্য এমন গবেষণার সুযোগ সব সময় আসে না। গত ২ বছর পূর্বে ঢাকা স্কুল অফ ইকোনোমিকস এ প্রথমবারের মতো পরিবেশ অর্থনীতির উপর স্নাতক ডিগ্রী চালু করা হয়েছে। সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে গত মঙ্গলবারে সংঘটিত দুর্ঘটনা সেখান কার ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য অমূল্য গবেষণার বিষয় হতে পারে।

ছবি কৃতজ্ঞতা: ২ নম্বর ও শেষ ছবি ২ টি জনাব সাকির আহমেদের ফেসবুক থেকে (অনুমতিক্রমে), ৩ নম্বর ছবিটি ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকা হতে ও অন্যান্য ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

এই লেখাটা শুরু করেছিলাম গতকালকে উপরে নির্দিষ্ট করে দুর্ঘটনা কবলিত স্থানের পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের উপর সম্ভব্য ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বলেছিলাম যার বেশ কয়েকটির কথা পড়লাম আজকের বিভিন্ন সংবাদ পত্রে।

লেখায় নিম্নলিখিত তথ্য সূত্র ব্যাবহার করা হয়েছে

===========================
১) Guidelines for the Bioremediation of oil-contaminated salt marshes [http://www2.epa.gov/sites/production/files/2014-10/documents/salt_marshe…

২) Baker, J,M, Bayley, J.A., Howells, S.E., Oldham, J., Wilson, M. (1989) Oil in wetland. In B. Dicks (ed): Ecological Impacts of the Oil Industry, John Wiley & Sons Ltd, Chichester, U.K., pp 37-59.

৩) The Galeta Oil Spill III. Chronic reoiling and long-term toxicity of hydrocarbon residues in the mangrove fringes community [http://portal.nceas.ucsb.edu/working_group/valuation-of-coastal-habitats…

৪) Clean Up Spilled Fuel Oil Thoroughly
[http://www.ag.ndsu.edu/flood/media-resources/news-releases/after-the-flo…

৫) Summary of the Literature on the Use of Commercial Bioremediation Agents of Commercial Bioremediation Agents for Cleanup of Oil Contaminated Environments [http://www.epa.gov/oem/docs/oil/fss/fss09/nichols_summary.pdf]

৬) Birds, Feathers, and Oil; How Does oil affect feathers? [http://education.nationalgeographic.com/education/activity/birds-feather…

৭) U.S. EPA’s Response Techniques for controlling oil spills and minimizing their impacts on human health and the environment [http://www2.epa.gov/emergency-response/epas-response-techniques]

৮) Microbes and Oil spills [http://academy.asm.org/images/stories/documents/Microbes_and_Oil_Spills….

পরিবেশ বিজ্ঞান বিষয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ভাল তথ্য সুত্র:

৯) Environmental Effects of Oil Spills [http://www.itopf.com/knowledge-resources/documents-guides/environmental-

(লেখক কানাডার ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয় এ পৃথিবী ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে পি এইচ ডি গবেষণায় অধ্যয়নরত)

লেখাটি ‘প্রিয় ডট কম’ এ গত ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৪ তারিখে প্রকাশিত

Check Also

এসেছে বাংলার ওয়াইল্ড মেন্টর

এই অ্যাপটির প্রধান উদ্দেশ্য, বিভিন্ন প্রাণির সামগ্রিক বিবৃতি উপস্থাপন। বৈজ্ঞানিক নাম থেকে শুরু করে, কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রাণির বিভিন্ন বয়সের ছবি, স্বভাব, আচরণ, আকার-আকৃতি, রঙ, খাদ্য, ইত্যাদি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যাবে এখানে খুব সহজেই। এমনকি পৃথিবীর কোথায় কোথায় এর অস্তিত্ব আছে, সেটিও ম্যাপের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে এখানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *