কী পেলাম লিমা সম্মেলন থেকে?

প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক

সমুদ্রতল বেড়ে গেলে সারাবিশ্বের সাগরগুলোর তল বেড়ে যাবে। ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়; সমুদ্রতলের কাছাকাছি উচ্চতার বিশ্বের অনেক ধনী কিন্তু নিচু দেশ যথা ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস এবং মালদ্বীপও সাগরে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। সম্প্র্রতি ‘ইরিন’ ও ‘স্যান্ডি’ ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সমুদ্রতলের কাছাকাছি অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নগরী নিউইয়র্ক সিটি ও ‘ক্যাটরিনা’র কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিয়ন্স সিটি ডুবে যায়। এসব ঘটনা মোটেই ছোট করে দেখার বিষয় নয়। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত ৬৯তম সাধারণ বিতর্কে ১৯৩ সদস্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়ে নানা বিষয় তুলে ধরেন। এই সময় ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক শহরে ৪ লাখ লোক জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে প্রতিবাদ পদযাত্রা করে। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব জলবায়ু সামিট আয়োজন করেন। ডিনারে রাষ্ট্রপ্রধানরা জলবায়ুর পরিবর্তন বিষয়ে আলাপ করবেন, কথা ছিল। কিন্তু চীন, ভারত ইত্যাদি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এই সামিট ও ডিনারে উপস্থিত না থাকায় অনেকে হতাশ হয়েছেন। কানাডা কিয়োটো প্রটোকল ত্যাগ করেছে (২০১১)। অস্ট্রেলিয়া আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বাংলাদেশ ও অনেক উন্নয়নশীল দেশ জ্বালানির জন্য কয়লার ব্যবহার বাড়িয়ে চলেছে। তাই জাতিসংঘের সামিটটি আগামী ডিসেম্বর ২০১৫ নাগাদ অনুষ্ঠিতব্য প্যারিস সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক চুক্তির বিষয়ে এক ধরনের হতাশাই সৃষ্টি করেছে।

c399b063-2d59-43b3-81e5-66ec9b02701b-620x372

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কিয়োটো প্রটোকল ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৫ থেকে কার্যকর রয়েছে ও বর্তমানে ১৯২টি রাষ্ট্র এবং একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংস্থার সমর্থন পেয়েছে। এই প্রটোকলে ৩৭টি শিল্পোন্নত দেশের সম্মিলিত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ১৯৯০-এর পরিমাণ থেকে ৫.২%  কমানোর অঙ্গীকার রয়েছে। তবে ১৯ ডিসেম্বর ২০০৯ কোপেনেহেগেনে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনের পরই আমরা কার্বন নিঃসরণ/বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি/জলবায়ু পরিবর্তন/সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশের দেড় কোটি সম্ভাব্য জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষদের দায়ী দেশগুলোর বিস্তীর্ণ জনশূন্য এলাকায় বসতি স্থাপনের সুযোগ দেওয়ার দাবি করে আসছি। গত ২৩ নভেম্বর ২০১৩ সালে ওয়ারসোতে অনুষ্ঠিত ১৯তম সভায় একটি চুক্তির খসড়া হয়, যা ডিসেম্বর ২০১৫ সালে প্যারিসে ২১তম কপ কনফারেন্সে সব দেশের প্রতিনিধিরা স্বাক্ষর করবেন। গত ১-১২ ডিসেম্বর ২০১৪ পেরুর লিমা শহরে ২০তম কপ কনফারেন্সে সেটাই আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই কনফারেন্সটি কোনো বাস্তব অগ্রগতি করতে না পেরে বরং মুখ থুবড়ে পড়েছে।

লিমা কনফারেন্স কোনো সমঝোতাপত্রই প্রস্তুত করতে পারছিল না। শেষমেশ একটা হলো বটে। তা হলো প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। নরম কথায় সদস্য দেশগুলোর প্রতি এক প্রকার আবেদন মাত্র। আগে বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোনো হচ্ছিল, তা ওই সমঝোতাপত্রে অরণ্যে রোদনের মতো শোনাচ্ছে। যদিও লিমা সমঝোতাপত্রে ডারবান কনফারেন্স ২০১১-তে নেওয়া Ad Hoc Working Group on the Durban Platform for Enhanced Action–এর কার্যপরিধি সম্পর্কে সহমত জানিয়ে আগামী ডিসেম্বর ২০১৫ নাগাদ একটি দলিল প্রস্তুতের পুনঃঅঙ্গীকার করা হয়েছে। তবে এই সমঝোতাপত্রের সূচনায় কিয়োটো প্রটোকলভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব সৃষ্টির ব্যাপারে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এই সমঝোতাপত্রের ৮নং ধারায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা কমানোর বিষয়টি প্রতিটি দেশের intended nationally determined contributions (INDC) হিসেবে গণ্য করে বিষয়টি বাধ্যবাধকতামূলক আর রাখা হয়নি। তাই এর ৯নং ধারায় প্রতিটি দেশের INDC সম্পর্কে জানাতে বলা হয়েছে এবং এর ১৩নং ধারায় আগামী প্যারিস কনফারেন্সের আগেই যাতে তা পাওয়া যায় (বাধ্যতামূলক নয়), সে কথাই বলা হয়েছে। গত ২৪ অক্টোবর ২০১৪ ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ রোধে এক বিশেষ চুক্তিতে উপনীত হয়। এর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো ২০৩০ সাল নাগাদ ১৯৯০ সালের মাত্রা থেকে ৪০% গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমিয়ে দেবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এর আগে ২০২০ সাল নাগাদ ২০% গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর চুক্তি করেছে। উন্নত বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে জার্মানি, যে দেশটি দুটি বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়ে একেবারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বিজয়ী শক্তিদের চাপে পড়ে এই দেশটি কোনো সামরিক শক্তি অর্জনের দিকে না গিয়ে ক্রমশ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। বর্তমানে ২৮টি দেশের ইউরোপীয় ইউনিয়নে জার্মানিই নেতৃত্ব প্রদানকারী দেশ। জার্মানি জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারেও অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে তার দেশের জ্বালানি ব্যয়ে অভূতপূর্ব নজির রাখছে। জার্মানির নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ ২০০০ সালে ৬.৩% থেকে ২০১৪ সালের প্রথমার্ধে এখন প্রায় ৩০% হয়েছে। জার্মানির নেতৃত্বেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা কমানোর লক্ষমাত্রা নির্ধারণের জন্য দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে এককভাবে সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ চীন বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ তাদের দেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা চূড়ান্ত পর্যায়ে পেঁৗছবে, তারপর কমবে। বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ নাগাদ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা ২৮% কমানোর কথা ভাবছে। তৃতীয় দেশ ভারত তার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন চায়; তাই তারা এ ধরনের চুক্তির সরাসরি বিরোধিতা শুরু করেছে। চতুর্থ দেশ রাশিয়া এ ধরনের উদ্যোগকে অগ্রাহ্য করছে। অস্ট্রেলিয়া গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রার বিষয়টি আর গুরুত্ব দিতে চাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা কমানোর লক্ষ্যে এখন থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও বিশ্বের অন্যান্য দেশ ভিন্নপথে হাঁটবে বলে প্রতীয়মান।

লেখক,

সাবেক মহাপরিচালক
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা

minamul@gmail.com

লেখাটি দৈনিক সমকাল’এ ২৩/১২/২০০১৪ তারিখে প্রকাশিত।

Check Also

জলবায়ু পরিবর্তনঃ যে ৯ টি কারণে ২০১৮ তে আমরা আশাবাদি হতেই পারি!

সাদিয়া লেনা আলফি গেল বছরটি ছিলো জলবায়ুর জন্য বেশ আশঙ্কাজনক। বিষয়টি মূলত ঘটেছে বর্তমান বিশ্বের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *