ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান ! ক্যামোফ্লেজ- পর্ব ১

আসিফ আহমেদ

ক্যামোফ্লেজ বা ছদ্মবেশ একটি অতি প্রাচীন শিল্প। ‘হয় মরো, না হয় মারো’… প্রানীজগতের এই রীতির কারণেই প্রানীরা নিজেদের বেঁচে থাকার তাগিদে নানা পথ বেছে নেয়। এর মধ্যে অন্যতম এই ক্যামোফ্লেজ। শিকার করতে অথবা শিকারীর হাত থেকে বাঁচতে ছোট বড় প্রানীরা যে সব কান্ড কারখানা করে তা আপনার কল্পনাকেও হার মানাবে। পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে এরা সব কিছু করতে প্রস্তুত, এবং এর মাধ্যমেই তাদের অসামান্য চাতুর্যের প্রমাণ মেলে। ডারউইন যে বলে গেছেন, ‘Survival of the fittest’। বেঁচে থাকতে গেলে ‘ফিট’ যে হতেই হবে! প্রানীজগতের সেরা কিছু ছদ্মবেশ নিয়ে আজকের এই আয়োজন।

১। ব্যাট ফেসড টোড

1

বাড়ির পাশের পুকুরের ব্যাঙও যে কতোটা বোকা বানাতে পারে তা এই ব্যাঙটাকে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। কিন্তু বাড়ির পাশে এদের দেখা পাবেন না। কলম্বিয়ার জাতীয় উদ্যানে এদের পাওয়া যায়। এরা ঝরা পাতার সাথে মিশে মাটিতে পড়ে থাকে। দেখতেও অবিকল পাতার মত। হাঁটার সময় পায়ের নিচে পড়াটা তাই অস্বাভাবিক কিছু না। এদের শরীরের গড়নও বেশ চ্যাপ্টা।

২। কমন ব্যারন ক্যাটারপিলার

2

পতঙ্গ-কূলে কমন ব্যারন ক্যাটারপিলারের ছদ্মবেশ এক কথায় অনিন্দ্য সুন্দর। অত্যন্ত সুনিপুণ দক্ষতায় এরা পাখি আর পতঙ্গভোজি প্রাণীদের ধোঁকা দেয়।আম গাছে এরা প্রধানত বাসা করে এবং আমের পাতায় চলে এদের কৌশলী পদচারণা। যার কারণে এরা আমচাষি ও কৃষকদের মাথা ব্যাথার কারণ। দক্ষিন এশিয়া, বিশেষ করে ভারতে এদের পাওয়া যায়।
মজার ব্যাপার হল, এরা লার্ভা থেকে যতই জীবনের পরবর্তী ধাপের দিকে এগিয়ে যায় ততই ওদের টিকে থাকার অসাধারন ক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে থাকে। একটা পর্যায়ে তা পুরোপুরি হারিয়ে যায়। দিনের আলো নিভে গেলে এরা পাতার উপর স্বাচ্ছন্দ্যভাবে বিচরণকরে।

৩। ডেড লিফ ম্যান্টিস

3

 

অত্যন্ত ধূর্ত এই পতঙ্গ বনের মরা পাতার মাঝে লুকিয়ে থাকে। শুধু তাই না…এদের শরীরের প্রায় পুরোটাই অবিকল মরা পাতার মত। এতে যে তারা শুধু শিকারীর চোখকে ফাঁকি দেয় তা না, শিকারকেও খুব সহজে বোকা বানাতে পারে। ভয়ংকর শিকারীদের তালিকাতে এদের রাখা যায়। সামনের পা দুটো মারাত্মক শক্তিশালী। মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনে এদের দেখা মেলে। সাউথ আমেরিকাতেও এদের খুঁজে পাওয়া যায়। অবাক ব্যাপার…পোষা প্রাণী হিসেবে এদের বেশ কদর আছে!

৪। মসি লিফ টেইল্ড গেকো

4

ছবিতে একে যদি খুঁজে পেয়ে থাকেন তো দেখে মনে হতে পারে বেচারা গেকোটার পুরো শরীর মসে (শৈবাল) ঢেকে গেছে। আপনার এই সমবেদনা নিমিষেই বিস্ময়ে রুপ নেবে যখন জানবেন যে এটাই তার ত্বক। ছদ্মবেশে অত্যন্ত পারদর্শী এই প্রানীকে দেখতে চাইলে আপনাকে সুদূর মাদাগাস্কারে যেতে হবে। আর কোথাও এর খোঁজ মেলে না।

৫। ডেড লিফ প্রজাপতি

5

এই প্রজাপতির ডানায় অভিযোজন ও বিবর্তনের অনুপম প্রদর্শনীর দেখা মেলে। ডানার নিচের অংশ ঠিক যেন শুকনো মরা পাতা। উপরের অংশ যথারীতি অন্যান্য প্রজাপতির মত। মিলনের পূর্বে এরা সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে ডানার উপরের রঙ্গিন অংশের ব্যবহার করে। আর বিপদের সময় ডানা বন্ধ করে মরা পাতার আকার নেয়। এশিয়ার উষ্ণপ্রধান অঞ্চলে এদের পাওয়া যায়।

৬। স্টোনফিস

6

ভারত বা প্রশান্ত মহাসাগরের সাতার কাটার সময় যদি দেখেন কোন কোরাল আপনার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে তাহলে বুঝবেন আপনি স্টোনফিস দেখছেন। এমনকি দুনিয়ার সবচেয়ে বিষধর মাছ গুলোর একটি এই স্টোনফিস। পরিবেশের সাথে মিশে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ওস্তাদ এরা। কিম্ভুতকিমাকার এই মাছ খুব ভাল শিকারী। ভয়াল দর্শন এই মাছের দাঁত, শিকারকে নিমিষেই ছিড়ে ফেলে।

৭। লিফ টেইল্ড গেকো

7

বন্যপ্রানীবিদদের কাছে এই গেকো এক বড় বিস্ময়। এর ছদ্মবেশ নিয়ে পড়া বা লেখার চেয়ে নিজ চোখে দেখে নেয়া ভাল। Uroplatus গোত্রের সবচেয়ে ছোট সদস্য এরা। লাল চোখ আর ভয়ংকর রুপের জন্যে এদের অশুভ বা নারকীয় মনে করা হয়। Satanic বা Devil বলা হয়ে থাকে এই গেকোকে। যে কয়েকটি প্রাণীকে শুধুমাত্র মাদাগাস্কারে পাওয়া যায় তাদের মধ্যে লিফ টেইল্ড গেকো একটি। এরা নিশাচর।

৮। উলফ স্পাইডার

8

এদের নাম নিয়ে ভাবনায় পড়বেন না। পূর্বের বন্যপ্রানীবিদরা এদের দলবদ্ধ শিকারি ভেবে ভুলবশত এমন নামকরণ করেন। কালো বাদামী বা ছাই রঙের দরুন এরা খুব সহজে চারপাশের শিকারীদের বোকা বানায়।
এরা অন্য মাকড়শাদের মত জালের মাধ্যমে শিকার করেনা। দুই ভাবে এদের শিকার করতে দেখা যায়। খুব ক্ষিপ্র গতিতে আক্রমন করা ছাড়াও এরা লুকিয়ে থেকে শিকারিকে বাগে আনে। পৃথিবীর প্রায় সবখানে এদের দেখা মেলে।

(চলবে…)

লেখক,
শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Check Also

মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন প্রায় ১১,৫০০ বছর আগে!

অববাহিকা ক্ষয় মূলত শুরু হয় নিওলিথিক বিপ্লবের সময়, যখন মানবসমাজ পশু শিকার ও সংগ্রহের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে কৃষিভিত্তিক সমাজ গঠন শুরু করে। এর ফলে পৃথিবীতে জনসংখ্যা লক্ষনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *