পারমানবিক বোমার অবশিষ্টাংশ থেকে কচ্ছপের বয়স নির্ধারণ!

মো: আরাফাত রহমান খান

১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকা সরকার প্রশান্ত মহাসাগরের পানিতে কিছু বিপদজনক পারমানবিক বোমার উপর পরীক্ষা- নিরীক্ষা চালায়। এই পরীক্ষার ফলে প্রচুর পরিমাণ নিওক্লীয় বিচ্ছুরণ প্রবালের কাঠামোতে সঞ্চিত হয়। শুধু সামদ্রিক প্রবালেই নয় এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ সঞ্চিত হয়েছে সামদ্রিক কিছু কচ্ছপের খোলসেও।

বর্তমানে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক কিছু মৃত কচ্ছপের খোলসের উপর পারমানবিক বোমার অবশিষ্টাংশের উপস্থিতির  উপর ভিত্তি করে কচ্ছপের বয়স নির্ধারণ করতে পেরেছেন। তাঁরা এটাও ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হয়েছেন কেন প্রাণিগুলো অনুকূল পরিবেশে থাকা সত্ত্বেও পূর্ণ বয়স্ক হতে আগের চেয়েও দীর্ঘ সময় নিচ্ছে।hawksbill turtle

হাওয়াইতে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ সামদ্রিক কচ্ছপ হলো হাক্সবিলসবুজ কাছিম। প্রধান গবেষক কাইল ভেন বলেন “১৯৭০ সালের শুরুতে প্রচুর পরিমাণ সবুজ কাছিমকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা হয় “Endangered Species Act” বা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি সংরক্ষণ নীতির মাধ্যমে। হাক্সবিল এর ক্ষেত্রে একই সংরক্ষণ নীতি অবলম্বন করা সত্ত্বেও এদের টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীদের ধারণা এই পর্যবেক্ষণ দুটি বিষয়কে আরোপ করেঃ তাদের পূর্ণতা প্রাপ্তিতে বিলম্ব ও খাদ্যর যোগান কমে যাওয়া”।

ভেন, যিনি নিকোলাস স্কুল অব এনভায়রনমেন্ট এর সহকারী অধ্যাপক ও তার দল ৩৬ টি মৃত হাক্সবিল কচ্ছপের খোলসে কার্বন-১৪ ডেটিং এর মান বের করেন; এর উপর ভিত্তি করে প্রবালের চারপাশে সঞ্চিত পদার্থের মান থেকে এদের বয়স নির্ধারণ সম্ভব। নিউক্লিও পরীক্ষা করার সময়ে প্রবালগুলোকে অনেকটা চোখা অস্ত্রের আকার দেওয়া হয় ঠিক যখন স্নায়ু যুদ্ধ চলছিলো এবং ধীরে ধীরে ধীরে এর ব্যবহার কমতে থাকে। তখন প্রবালগুলোকে অনেকটা শক্ত লোহার কাঠামোর মতই মনে হয়।hawksbill-turtle-shell

যদিও কার্বন ডেটিং পদ্ধতি আজকাল নতুন নয়। ভেন, কার্বন ডেটিং বোমা নামের নতুন একটি পদ্ধতি অবলম্বন করেন। ভেন বলেন “ এর প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তার মান অনেক নিম্ন” একটি নির্দিষ্ট ভূতাত্ত্বিক সময় পর্যন্ত একে আবদ্ধ রাখা সম্ভব। কার্বন ডেটিং বোমার সাহায্যে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কার্বন-১৪ ডেটিংকৃত সকল নাটকীয় প্রবালিক অস্ত্র চিহ্নিত করা সম্ভব তাপ-পারমানবিক পরীক্ষায় বায়ুমণ্ডলীয় নিঃসরণের কারণে।

এই নতুন ডেটিং পদ্ধতি প্রাণিদেহে ৮ টি নির্দিষ্ট বৃদ্ধি রেখা চিহ্নিত করে যা ফাঁপা হাড়ের টিস্যু গুলোতে বার্ষিকভাবে জমতে থাকে , যেখানে প্রথমদিকে কেবল একটিই ধারনা করা হত।

এই কারণেই ভেন ও তার দল বুঝতে পারলেন স্ত্রী কচ্ছপ প্রাপ্তবয়স্ক হতে একটু বেশি সময় নেয়, তারা আগে যা ভেবেছিলেন তার চেয়েও বেশি – অনেকটা ১৫ থেকে ২৯ বছরের মাঝামাঝি সময়ে। এছাড়া চোরাচালান ও অবৈধভাবে কচ্ছপের খোলস বাজারজাত করায় কচ্ছপগুলো পুনঃআবির্ভাব করতে অনেক দেরি হচ্ছে। একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাপ্তবয়স্কতা অর্থাৎ প্রজনন সময়কাল আগে যা ভাবা হতো তার চেয়ে দ্রুত অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়।

কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কচ্ছপগুলো তাদের খাবারের সাথে বোমার অবশিষ্টাংশ গ্রহণ করে। দলটি খুঁজে বের করে হাওয়াই এর চারদিকে প্রবাল প্রাচীর হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে কচ্ছপগুলোর গতানুগতিক খাবারের উৎস স্পঞ্জ, এনিমন, স্কুইড ও চিংড়ি যারা এই প্রবালে বেঁচে থাকে তারাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে কচ্ছপগুলো সর্বভুক হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের শাকাহারি হিসেবে মানিয়ে নিচ্ছে। এই খাদ্য শৃঙ্খলে ব্যাঘাত পাওয়াই হয়ত কচ্ছপগুলোর পুনরায় জন্মদান এর প্রক্রিয়াকে আরও মন্থর করে দেওয়ার অন্যতম কারণ।

এই গবেষণা চালানোর জন্য দলটি আইন প্রয়োগকারি সংস্থা, সরকারি আমলা অনুমতি সাপেক্ষে ও প্রদর্শনশালা থেকে হাক্সবিল কচ্ছপের খোলস সংগ্রহ করে। শত বছরেরও উর্ধ্বে হাক্সবিল কচ্ছপের খোলস কেবলমাত্র অলংকরণের উদ্দেশ্যে ব্যাবহার করা হতো। ১৯৭৭ সালে “ আন্তর্জাতিক বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণি ও উদ্ভিদ বাণিজ্য সম্মেলন” নামক একটি খসড়া বাস্তবায়িত হয় । যদিও এখন পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণ হাক্সবিল কচ্ছপের খোলস বাজারজাত করা হচ্ছে। গত বুধবার রয়েল সোসাইটিতে প্রকাশিত প্রবন্ধে একদল গবেষক বলেন ‘‘১৯৫০ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০,০০০ হাক্সবিল কচ্ছপের খোলস প্রতিবছর বাজারজাত করা হয়”।

যদি কোনো উপায় এদের বয়স ও এদের নির্দিষ্ট বয়সে এদের খাবারের চাহিদা নির্ধারণ করা সম্ভব হয় তবে খুব সহজেই এদের সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রিপোর্টে বলা হয় “বর্তমানে পৃথিবীতে হাওয়াইয়ান হাক্সবিল কচ্ছপের পরিমাণই সংখ্যায় সবচাইতে কম। তারা আরও বলেন এবারই প্রথমবার সামদ্রিক কচ্ছপের খোলসের টিস্যুর কার্বন-১৪ ডেটিং এর মাধ্যমে এদের বয়স, বৃদ্ধি ও পরিপূর্ণতা হিসেব করা হয়েছে।

Check Also

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনের নিরবতাই চিকুনগুনিয়ার ব্যপকতার জন্য দায়ী

১৯৫২ সালে প্রথম তানজানিয়ায় চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ৬০টি দেশে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে ২০০৮ সালে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের অস্তিত্ব ধরা পড়লেও এবছরের মে মাস থেকে তার প্রকোপ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *