পলিথিন নিষিদ্ধে এবং পাটজাত পণ্যের বিস্তারে আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করার দাবী

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নিষিদ্ধ পলিথিন। এছাড়া এক ধরনের রঙিন পলিথিনের টিস্যু (যা চায়না টিস্যু নামে পরিচিত) ব্যাগে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। বিভিন্ন জুতা ও মোবাইল কোম্পানী, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ফ্যাশন হাউজ, কাপড়ের দোকানসহ অনেক নামকরা প্রতিষ্ঠান টিস্যু ব্যাগ ব্যবহার করছে। পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি বিবেচনায় পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব পণ্যের বিস্তারে পলিথিন নিষিদ্ধকরণ আইন এবং পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন জরুরী। আজ ৩১ জানুয়ারি ২০১৬, সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে “নিষিদ্ধ পলিথিনে পরিবেশ বিপর্যয় এবং পাটজাত ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের চ্যালেঞ্জসমূহ” শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা উক্ত অভিমত ব্যক্ত করেন।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা),  বাংলাদেশ পরিবেশ বান্ধব শপিং ব্যাগ প্রস্তুতকারক অর্গানাইজেশন (বিইএসএমও),  কেরানীগঞ্জ শপিং ব্যাগ ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লি: এর উদ্যোগে আয়োজিত উক্ত আলোচনা পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের খানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পবার নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোঃ আবদুস সোবহান। আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি সহিদুল্লা চৌধুরী, বিজেএমসি-র পরিচালক  বাবুল চন্দ্র রায়, পবার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডাঃ লেলিন চৌধুরী, বিইএসএমও-র সভাপতি আব্দুর রানা, কেরানীগঞ্জ শপিং ব্যাগ ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিঃ -র উপদেষ্টা শহীদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক এ বি সিদ্দিক প্রমুখ।

আলেচনা সভায় প্রধান অতিথি বলেন, ৬ টি পণ্যে পাটের  বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার ফলে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি ২০ লাখ বেল পাটের অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ অবৈধভাবে চলছে। সরকার শুধুমাত্র রপ্তানীকাজে ব্যবহারের জন্য ৫% শুল্কে পলিথিনের কাঁচামাল আমদানীর অনুমতি দিয়েছে। বাস্তবে এসব কাঁচামাল দ্বারা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন হচ্ছে। এক্ষেত্রে এনবিআর এর ভ’মিকা হতাশাব্যঞ্জক। একইভাবে পলিথিন আইন বাস্তবায়নে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ’মিকা প্রশ্নবিদ্ধ। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সাফল্য স্থায়ী করার লক্ষে এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধকরণ আইন কঠোরভাবে বাসাতবায়ন করা হবে। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা ক্ষতিকর পলিথিন বর্জন করে পরিবেশবান্ধব পাট, কাগজ, কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারে সাফল্য অর্জনে সক্ষম হবো।

মূল বক্তব্যে বলা হয় বন্ড লাইসেন্সের মাধ্যমে আমদানীকৃত পলি প্রোপাইলিন অবৈধভাবে নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকা শহরে একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। সে হিসেবে শুধুমাত্র ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ৪০ লাখের বেশী পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার শেষে ফেলে দেয়া হয়। এগুলো দ্বারা ড্রেন, নালা-নর্দমা, খাল, ডোবা ইত্যাদি ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয় এবং সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টিস্যু ব্যাগ উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে। এসব ব্যাগ দেখতে কাপড়ের মতো হলেও আগুনে গলে যাচ্ছে। বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষণায় টিস্যু ব্যাগে পলিথিনের মতো পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে। পলিথিন ও টিস্যু ব্যাগ ব্যবহারের ফলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির পাশাপাশি কাগজ ও কাপড়ের ব্যাগের চাহিদা কমে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে পরিবেশবান্ধব পাটের কদর, কমছে পাট চাষ। বন্ধ হচ্ছে কাগজ, পাট ও কাপড়ের ব্যাগের কারখানা। বেকার হচ্ছে কুটিরশিল্পের মালিক ও শ্রমিক-কর্মচারীরা। সারা বিশ্বে পাটের চাহিদা বাড়লেও আমাদের অবহেলা ও সচেনতার অভাবে সোনালি আঁশ পাট আজ বিলুপ্তির পথে। আমাদের এ শিল্পকে ফিরিয়ে আনতে সরকারকে কার্যকর ভ’মিকা পালন করতে হবে এবং জনগণকে সচেতন হতে হবে।IMG_4602
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (২০০২ সনের ৯ নং আইন দ্বারা সংশোধিত) এর ৬ক ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার সকল বা যে কোন প্রকার পলিথিন শপিং ব্যাগ, বা পলিইথাইলিন বা পলিপ্রপাইলিনের তৈরী অন্য কোন সামগ্রী পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হলে, এরূপ সামগ্রীর উৎপাদন, আমদানী, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ৫৩ নং আইন) (২০১৩ সনের ৩৮ নং আইন দ্বারা সংশোধিত) এর ধারা-৪ পণ্য সামগ্রীতে পাটজাত মোড়ক ব্যবহারঃ কোন ব্যক্তি বিধি দ্বারা নির্ধারিত পণ্য, পাটজাত মোড়ক দ্বারা মোড়কজাতকরণ ব্যতিত, বিক্রয়, বিতরণ বা সরবরাহ করতে পারবে না। ধান, চাল, গম, ভুট্রা, চিনি ও সার মোড়কীকরণে ১০০% পাটজাত বস্তা ব্যবহারের বিধান বাস্তবায়নে সম্প্রতি পাট মন্ত্রণালয় এবং পাট অধিদপ্তর মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে হবে।

পাট উৎপাদনে কৃত্রিম তন্তু উৎপাদনের তুলনায় পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব অনেক কম । পাট চাষে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, আগাছানাশক বা ছত্রাকনাশকের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে অনেক কম। প্রতি হেক্টরে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ৭-৫৩ কেজি। পাট চাষে ব্যবহৃত সারের পরিমাণ এতই কম যে জমিতে এর প্রভাব খুবই নগণ্য। প্রতি হেক্টর জমিতে পাট গাছের ৫-৬ টন সবুজ পাতা পড়ে। এসব সবুজ পাতা পরবর্তী ফসলের জন্য সার হিসেবে কাজ করে। প্রতি একর জমিতে প্রায় ৩ মেট্রিক টন শিকড় মাটিতে থেকে যায়। ফসল পরিক্রমায় পাট চাষ করা হলে পরবর্তী ফসলের জন্য মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।

পাট একটি প্রাকৃতিক আঁশ যার অসংখ্য পরিবেশগত সুফল রয়েছে। পাট ১০০% জীবাণুবিয়োজ্য ও নবায়নযোগ্য সম্পদ এবং প্রতি ইউনিট জমিতে প্রচুর বায়োমাস উৎপাদন করে। পাট পণ্য জীবাণুবিয়োজ্য বিধায় তা উৎপাদন জীবনচক্রের শেষে মাটিতে মিশে যায়। পাট অনেক বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড আত্তীকরণে সক্ষম। বর্তমানে বাজারে পাটের তৈরী আসবাবপত্র, গৃহসজ্জার পণ্য ও ব্যাগ সহজলভ্য, যা পলিথিন ব্যাগ ও কাঠের আসবাবপত্রের সেরা বিকল্প। আমাদের পরিবেশ ও পাটের সুফল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে অনেক মানুষ তাদের জীবনযাত্রায় পাট পণ্য অন্তর্ভুক্ত করছে। পাটের ব্যাগ ও আসবাবপত্র ছাড়াও পাট পণ্য  উৎপাদনকারীরা পাটের তৈরী বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করছে, যেমন-স্টেশনারি পণ্য, শিল্প ও কারুশিল্প, সজ্জাসংক্রান্ত দ্রব্যাদি, পোশাক, পাদুকা, বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ, কার্পেট, গালিচা, কম্বল, ইত্যাদি।

পলিথিন নিষিদ্ধকরণ আইন এবং পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে, কাগজ, ও কাপড়ের ব্যাগের ব্যবহার বাড়বে, মাঠ পর্যায়ে কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাটের ব্যাগ আমেরিকায় রফতানির উদ্যোগ নেয়া হলে রফতানি আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষক পাট চাষে উৎসাহিত হবে এবং পাটের ন্যায্য দাম পাবে। বাংলাদেশ সোনালী আঁশ পাটের ঐতিহ্য ফিরে পাবে।
আলোচনা সভা থেকে নিন্মোক্ত সুপারিশ করা হয়-
পলিথিন নিষিদ্ধকরণ আইন এবং পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন অমান্যকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা।
পলিথিন ও টিস্যু ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পাট, কাপড়, কাগজের ব্যাগ ও ঠোংগা  ব্যবহার করা, এগুলো সহজলভ্য করা এবং এসব ব্যাগ ও ঠোংগা ব্যবহারে জনগণকে উদ্ভুদ্ধ করা।
পলিথিন ও টিস্যু ব্যাগ তৈরীর কাঁচামাল আমদানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং বন্ড লাইসেন্সের মাধ্যমে আমদানিকৃত পলি প্রোপাইলিন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
পরিবেশ অধিদপ্তর, পাট অধিদপ্তর, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, এফবিসিসিআই, ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন এর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। এক্ষেত্রে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কার্যকর ভ’মিকা পালন করতে পারে।

Check Also

নাইট্রজেন চক্রের কথকতা, পর্ব-২

বাধাধরা নিয়মের পরেও লাগাম কেন হাতছাড়া এটা ধরতেই গবেষণা করেছেন ‘কলোরাডো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়’র গবেষকেরা। নাইট্রেট নিয়ে গবেষণা করলেও তারা কিন্তু অ্যামোনিয়ার বিষয়টি আসলে আগে বিবেচনায় আনেননি। ঝামেলাটা ধরা পড়ল সেখানেই। কৃষিক্ষেত্র থেকে নির্গত অ্যামোনিয়ার পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে জীবাশ্ম জ্বালানীকেও!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *