শাশ্বতী ফুল গাঁদা

জায়েদ ফরিদ

ভারত-বাংলাদেশে গাঁদা বা গেন্দা এমনভাবে দেশীয়করণ হয়েছে যে মনেই হয় না এই ফুলটা কোনো এক কালে সম্পূর্ণ বিদেশী ছিল। আমাদের দেশে বিয়ের বাসর, গাড়ি সাজানো, বিদায়, অভ্যর্থনা, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে গাঁদা যেন অপরিহার্য। বিদেশে সাধারণ ব্যবহার ছাড়াও গাঁদাফুল দিয়ে কফিন সাজানো হয়, গোরস্থানে রোপন করা হয় গাঁদা গাছ, যেমনটা দেখা যায় কাঠগোলাপের ক্ষেত্রেও, হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ, ফিলিপাইন বিভিন্ন দেশে।

african marigold
আফ্রিকান মেরিগোল্ড– সাহানা চৌধুরী মমি

গেন্দা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত গেণ্ডুক থেকে যার অর্থ গোলক। ইংরেজি Mary’s Gold থেকে Marigold. সাড়ে তিনশো বছর আগে এদেশে বড় আকারের আফ্রিকান গাঁদা (Tagetes erecta)র আগমন, দেখতে যা গোলকের মতো, আমরা একে থোকাগাঁদা বলে জানি। এ ছাড়া আরো দুধরনের গাঁদা আমাদের সুপরিচিত, যার একটি খুব আকর্ষণীয় রক্তরাঙা, কিনারা হলুদ, একে বলি রক্তগাঁদা (Tagetes patula)। ইংরেজিতে ফ্রেঞ্চ মেরিগোল্ড। তৃতীয় প্রকার গাঁদা সাদামাটা সিঙ্গেল পাপড়ির, মাঝখানে থোকা বীজ, নাম তারাগাঁদা (Tagetes tenuifolia), ইংরেজিতে সিগনেট মেরিগোল্ড। থোকাগাঁদা, রক্তগাঁদা ও তারাগাঁদার সবকটিই এসেছে মধ্য আমেরিকার মেক্সিকো অঞ্চল থেকে। কিন্তু আমেরিকার আদিবাসী হওয়া সত্ত্বেও থোকাগাঁদার নাম হয়েছে আফ্রিকান মেরিগোল্ড এবং রক্তগাঁদার নাম ফ্রেঞ্চ মেরিগোল্ড। এই অপ্রকৃত নামকরণের পেছনে আছে কিছু লজ্জাকর অজ্ঞতার ইতিহাস।

french marigold
ফ্রেঞ্চ মেরিগোল্ড- ছবি ইন্টারনেট

এখন যেখানে মেক্সিকো নগরী সেখানেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন অ্যাজটেক সভ্যতা (Aztec civilization), ৬০০ বছর আগে যারা গাঁদাকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করতো। ভক্তির কারণে একে নিয়ে তাদের কুসংস্কারও ছিল অদ্ভুত রকম। নদী পার হতে নিরাপত্তার জন্যে তারা সঙ্গে রাখত গাঁদাফুল, বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা করতো গাঁদা দিয়ে। স্পেনীয় ধর্মপ্রচারক এবং পর্যটকরা গাঁদার বীজ নিয়ে গেছেন নিজ দেশে অ্যাজটেক থেকে ৯০০০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিকের ওপারে। সেগুলো তারা লাগিয়েছেন মঠ আর আশ্রমের চাতালে। সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে গাঁদা চলে গেছে আফ্রিকা আর ফ্রান্সে। ইংরেজ পর্যটকরা যখন তিউনিস-এ গিয়ে পৌঁছাল তখন সেখানকার গাঁদা সম্পুর্ণভাবে দেশীয়করণ ও পরিবেশানুগ হয়ে গেছে। তারা ভাবলেন এগুলো নতুন ফুল, নাম দিলেন Flos africanus. অনুরূপ ঘটনা ফ্রান্সেও ঘটলো, যে কারণে রক্তগাঁদার নাম হল ফ্রেঞ্চ মেরিগোল্ড।

বিংশশতাব্দীর শুরুর দিকে আমেরিকাতে সুইট-পি আর এস্টার জাতীয় ফুল ছিল বেশ সমাদৃত কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সেগুলি রোগশোকে শ্রীহীন ও ফলনরহিত হয়ে পড়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এমন অভাবিত সময়ে ডেভিড বার্পি নামে আমেরিকার একজন পুষ্প-গবেষক ও বীজ ব্যবসায়ী নতুন করে গাঁদাকে আমেরিকায় বিস্তারের পথ সুগম করে দেন। এরপর ৩০ বছরে বিভিন্ন প্রজননকারী তৈরি করেছেন বিভিন্ন উচ্চতার ও পুষ্পাকার সম্বলিত নানাবিধ হাইব্রিড, গন্ধবিহীন গাঁদা, ট্রিপলয়েড ও সাদা গাঁদা।

ভারত উপমহাদেশে প্রবিষ্ট পর্যটকরা দেখেছেন, শস্য তোলার সময় থোকাগাঁদা দিয়ে পূজো দেয়া হচ্ছে পল্লী-দেবতাদের। তারা অনুমান করেছেন, গাঁদার রঙের সাথে মিলিয়ে হয়তো সেখানে ভুট্টা বা সদৃশ রঙের কিছু শস্যও প্রবর্তিত হয়ে থাকবে। তখনকার দিনে বৌদ্ধ সন্নাসীদের আলখেল্লা রঙ করা হত গাঁদার পাপড়ি দিয়ে। এখনো মেক্সিকোতে গিয়ে ভ্রমণকারীর দল দেখতে পাবে তারা পুরনো গাঁদা নিয়ে আছে, তার পাপড়ি দিয়ে চা খাচ্ছে, ধর্মাচার, ও ওষুধবিষুদ তৈরি করছে। আয়ুর্বেদ গাঁদাকে ব্যবহার করেছে কিডনিরোগ, পেশী ও কানের ব্যথা, অর্শ, কৃমি, মূত্রস্বল্পতায়, যক্ষা, রক্তপিত্ত ও রক্তয়ামাশয়ে।

বাগানে ফোঁটা অনেক রকম গাঁদা- সাহানা চৌধুরী মমি

ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে একসময় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মুরগী উৎপাদন করতে শুরু হয় ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন অনুমোদিত চিকেন-ফিড-এর ব্যবহার। ৬০ দশকের পর থেকে এই নিউট্রিশান পেলেট বা পুষ্টি-বড়ির ব্যবহারে দ্রুত রোগব্যাধিহীন মুরগী ও ডিম উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এ সব পুষ্টি-বড়ি ব্যবহারের ফলে দেখা গেল ডিমের কুসুমেরর রঙ খুব হাল্কা সাদাটে হয়ে গেছে এবং বাচ্চাগুলি মলিন দেখা যাচ্ছে। এর কারণ জানা গেল, পুষ্টি-বড়িতে লুটিন (Lutein) ও জিয়াজ্যান্থিন (Zeaxanthin)-এর পরিমাণ থাকে খুব সামান্য যা প্রকৃতি থেকে আহরিত খাবারে পাওয়া যায় বহুগুণ বেশি। গাঁদাফুলের পাপড়ি এই চাহিদা পূরণ করলো, লুটিন ও জিয়াজ্যান্থিন-সমৃদ্ধ কুসুমগুলি দেখতে হল টকটকে কমলা রঙের। এইসব উপাদান-সমৃদ্ধ কুসুম মানুষের চোখের জন্যে খুব উপকারী, বিশেষত ছানি পড়া এবং বয়স সংক্রান্ত দৃষ্টিহীনতা (AMD)র জন্যে। গাঁদাফুল এই উপাদানগুলি ব্যবহার করে অতিবেগুনি রশ্মিতে যাতে ফুলের পাপড়িগুলি জ্বলে না যায়।

গাঁদা গাছের শেকড় থেকে নিঃসৃত হয় থিওফিন রসায়ন যা বিভিন্ন রকম নেমাটোড-এর আক্রমণ থেকে গাছকে রক্ষা করে। এ-কারণে এই গাছ কম্প্যানিওন প্লান্ট বা সহচর গাছ হিশেবে অন্য গাছের সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রে লাগানো শুরু হয়েছে। এ-ধরনের জৈব নিয়ন্ত্রণ কীটনাশক ব্যবহারের তুলনায় অনেক ভাল। যে সব গাছ সহচর গাছ হিশেবে লাগানো উত্তম বলে বিবেচিত হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে তুলসী, ব্রকলি, শসা, বেগুন, আলু, এবং বাঙ্গি-তরমুজ। গাঁদা পাতার নিচের দিকে থাকে তৈল গ্রন্থি যা থেকে নিঃসৃত হয় ‘মেরিগোল্ড এরোমা’। এই গন্ধের কারণে অনেক পোকামাকড় দূরে থাকে। কিছু মানুষ এই গন্ধকে উৎকট বলে অভিহিত করার কারণে গবেষক ডেভিড বার্পি গন্ধহীন গাঁদা উদ্ভব করেছিলেন, কিন্তু সেই ফুল কখনো ভাল বাজার পায়নি।

বাগান-সাহিত্যে গাঁদা সম্পর্কে তেমন কিছু লেখা হয়নি অতীতে। ১৯৯৮ সনের USDA ফ্লোরিকালচার শুমার অনুসারে বলা হয়েছে গাঁদা পৃথিবীর সপ্তম প্রধান গার্ডেন প্ল্যান্ট। ট্যাগেটিজ গোত্রের প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ৪০, এর ভেতরে যে দুটি গাছ থেকে যাবতীয় হাইব্রিড তৈরি হয়েছে সেগুলি হল Tagetes erecta এবং Tagetes patula অর্থাৎ আফ্রিকান ও ফ্রেঞ্চ মেরিগোল্ড। তবে গবেষণার আওতায় Tagetes tenuifolia বা তারাগাঁদাও রয়েছে। ট্যাগেটিজ গোত্রের অনেক প্রজাতির ভেতরে আইরিশ লেস (Tagetes filifolia) নামে আরেকটি স্বল্প পরিচিত প্রজাতি আছে যা চাষ করা হয় মূলত পাতার জন্যে। পট মেরিগোল্ড (Calendula officinalis) নামে একটি সুপরিচিত গাছ আছে যাকে অনেকে গাঁদা বলে মনে করেন তা আদতে ভিন্ন গোত্রের গাছ।

থোকাগাঁদার গাছ বামুন প্রজাতির না হলে সাড়ে ৩ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ফুল স্বাভাবিক ৩ ইঞ্চি ব্যাসের মতো দেখা গেলেও কখনো সাড়ে ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। হলুদ, সোনালি, কমলা রঙের হলেও ১৯৭৫ সনে আমেরিকার এলিস ভঙ্ক নাম্নী এক ভদ্রমহিলা স্নোবল নামে একটি হাইব্রিড উদ্ভাবন করেছেন, যা সম্পূর্ণ সাদা, বিন্দুমাত্র হলুদ রঙ নেই তাতে। বাজারে ‘ফ্রেঞ্চ ভ্যানিলা’ নামের এই গাঁদা উদ্ভাবন করে ১০ হাজার ডলারের প্রতিযোগিতা জিতে নিতে এলিসের সময় লেগেছিল একুশ বছর।

থোকাগাঁদা তাপ-সংবেদী গাছ তাই চারা করার সময় শেড দিয়ে রাখতে হয় সপ্তাহ দুয়েক। স্বল্প আলোর ইনডোরে এই গাছ ভাল জন্মাতে পারে। থোকা গাঁদায় এখন পর্যন্ত বোধ হয় কোনো বাই-কালার দেখা যায়নি যেটা দেখা যায় অপেক্ষাকৃত ছোট রক্ত গাঁদায়। রক্তগাঁদার মেহগনি রঙও থোকা গাঁদায় অদ্যাবধি দেখা যায়নি। এদের পাপড়ির কিনারে ভিন্ন রঙ থাকে, যা হতে পারে কমলা-সোনালি, মেহগনি-হলুদ বা আরো ভিন্ন। রক্তগাঁদার মাঝখানের পুং ও গর্ভকেশর সম্বলিত জননক্ষম অংশটুকু থাকে অন্য রঙের। ট্রিপলয়েড নামে থোকাগাঁদা ও রক্তগাঁদার একটি সঙ্কর তৈরি হয়েছে যা থেকে বীজ তৈরি হয় না। প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধির নিয়মে বীজ ধারণ করতে অক্ষম হওয়ার কারণে এদের দুই-আড়াই ইঞ্চি ফুলের ফলন হয় প্রচুর, এমন কি মৌসুম চলে যাবার পরে তাপ বেড়ে গেলেও তাপ-সঙ্কট বা হিট-স্ট্রেস এদের ফলনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে না।

যে কয়েকজন বীজ ব্যবসায়ী এবং হাইব্রিড উদ্ভাবক গাঁদা নিয়ে গবেষণা করেছেন তাদের মধ্যে ডেভিড বার্পি ছাড়াও রয়েছেন গোল্ডস্মিথ, ডঃ মাটিল্ডে হলট্রপ, ডেভিড লেমন এবং ডঃ জন মন্ড্রি। হাইব্রিড তৈরি করা বেশ কষ্ট, ধৈর্য ও সময়সাপেক্ষ কাজ। F1 হাইব্রিড বা প্রথম অপত্যসংকর (First Filial Generation) তৈরিতে সৃষ্ট সঙ্কর-গাঁদার রূপ হয় প্রজনক (Parent) থেকে ভিন্ন। এতে কৌশলে কায়িক শ্রমে পুংকেশরগুলি কেটে দিতে হত যাতে স্বপরাগায়ণ না ঘটতে পারে। জিনিয়া ও গাঁদা গবেষক জন মন্ড্রি হঠাৎ প্রকৃতিতে আবিষ্কার করেছিলেন কিছু পুং-বন্ধ্যা গাছ। এই গাছ পাওয়াতে তার গবেষণার গতি বেড়ে গেল, উদ্ভাবিত হল অনেক অনেক নতুন হাইব্রিড।

লেখকঃ কিউরেটর (টেক) সায়েন্স ওয়েসিস মিউজিয়াম, রিয়াদ

Check Also

এসেছে বাংলার ওয়াইল্ড মেন্টর

এই অ্যাপটির প্রধান উদ্দেশ্য, বিভিন্ন প্রাণির সামগ্রিক বিবৃতি উপস্থাপন। বৈজ্ঞানিক নাম থেকে শুরু করে, কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রাণির বিভিন্ন বয়সের ছবি, স্বভাব, আচরণ, আকার-আকৃতি, রঙ, খাদ্য, ইত্যাদি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যাবে এখানে খুব সহজেই। এমনকি পৃথিবীর কোথায় কোথায় এর অস্তিত্ব আছে, সেটিও ম্যাপের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে এখানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *