নাগরিক ভাবনাঃ বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষায় সুশাসন

এ. বি. এম সিদ্দিকুল আবেদিন

“ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা
তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা”

বৈচিত্রময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উপাদান দ্বারা আবৃত বাংলাদেশ।পুষ্প, বৃক্ষ, তরুলতা, বিহঙ্গ কিংবা নদী চিরকালই এই শ্যামল বাংলার গণমানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে।  প্রাকৃতিক পরিবেশই আমাদের দেশকে করে তুলেছে আরও মোহনীয়, লাবণ্যময় ও ঐশ্বর্যপূর্ণ স্বর্গপুরী। ষড়ঋতুর প্রকৃতির সঙ্গে পরিবর্তনশীল রূপ, বর্ণ, গন্ধে বাঙালীর জীবনযাত্রার গতিধারা চলমান। এই দেশ প্রকৃতির দেশ, প্রকৃতির দান। প্রাকৃতিক পরিবেশের নিয়ম নিয়ন্ত্রিত গতি দ্বারা আমাদের জীবন প্রবাহমান। এই দেশের প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান বা বৈশিষ্ট্য আমাদের জীবন গঠনে অপরিহার্য এবং তা অমূল্য সম্পদ। প্রকৃতির সক্রিয়তা ও সজীবতা জীবনে এনে দেয় অফুরন্ত অভিজ্ঞতা।মাটির কোলেই আমাদের জন্ম আবার তাতেই আমাদের জীবনাবসান। তাই প্রকৃতির সাথেই মানুষের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে এগিয়ে চলছে।কিন্তু সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলার প্রত্যাশায় এখানে যত রকমের আপাত উন্নতি সাধিত হয়েছে প্রকৃতির ছন্দ-ততটুকুই অবনতি ঘটেছে।আমরা আজ নিজেদের হাতেই প্রকৃতির মূল উপাদান এই সবুজ শ্যামলিমাকে নিঃশেষিত করে বিনাশের পথে এগিয়ে চলেছি। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের অর্থনৈতিক কার্যক্রম, শিল্পায়ন, নগরায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, পানির অব্যবস্থাপনা ও সেচ প্রযুক্তি তথা রাসায়নিক সার-কীটনাশকের ব্যবহার আমাদের নানা প্রতিবেশ ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ভাণ্ডারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসা-বাণিজ্য, অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পবর্জ্য নির্গমন ও মাত্রারিক্ত প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বাংলাদেশের পরিবেশ সমস্যাগুলোকে গভীরতর করেছে। গ্রামীণ ক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের মূলে রয়েছে সম্পদের অতিরিক্ত আহরণ ও যথেচ্ছ ব্যবহার, কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার। অন্যদিকে নগর ও এর আশপাশের অঞ্চলে পরিবেশ দূষণের মূল হোতা হলো অপরিকল্পিত নগরায়ন, বায়ু দূষণ ও শিল্পবর্জ্য নিঃসরণ।পরিবেশগত সমস্যাগুলো গ্রামীণ জীবন, জনস্বাস্থ্য, জীবনমান এবং নগর জীবনকে ভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক অভিঘাত আমাদের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু বিপন্ন দেশগুলোর অন্যতম করেছে।উপযুক্ত জাতীয় নীতি, আইনের অভাব এবং এগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

বর্তমানে পরিবেশ সংরক্ষণ সব উন্নয়ন নীতি ও কৌশলে কেন্দ্রীয় স্থান অধিকার করছে।বাংলাদেশে ১৯৯২ সালে জাতীয় পরিবেশ নীতি গ্রহণ করা হয়। পরিবেশ নীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে সকল জাতীয় সম্পদের টেকসই, দীর্ঘমেয়াদী ও পরিবেশসম্মত ব্যবহারের নিশ্চয়তা বিধান এবং সকল প্রকার দূষণ ও অবক্ষয়মূলক কর্মকাণ্ড সনাক্তকরণও ও নিয়ন্ত্রণ করা।পরিবেশ সংরক্ষণে আইন হয়েছে। সুশাসন, আইনের সঠিক প্রয়োগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং একই সঙ্গে নাগরিক সচেতনতা পরিবেশ দূষণ ও অবক্ষয় রোধে একান্তভাবে জরুরি। পরিবেশ সংরক্ষণের মূল বিষয়গুলো জাতীয় নীতি ও কর্ম পরিকল্পনায় সংযুক্ত করার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের বিষয়ে বেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু আইন, নীতি, কর্মকৌশল, পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যথেষ্ট গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত নীতি-কৌশলে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

পরিবেশ সংরক্ষণে সুশাসন অপরিহার্য, যা সরকার, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকারসহ সবাইকে আরও বেশি দায়বদ্ধ ও দায়িত্বশীল করবে। পরিবেশ আন্দোলন দেশের বড় বড় শহরে এবং প্রতিবেশ অঞ্চলে সম্প্রসারিত করতে হবে। সচেতন নাগরিক সমাজের সঙ্গে গণমাধ্যম এ বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে ।একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক, আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্র ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য দরকার তেমনি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠাও অতি আবশ্যক। আবার পরিবেশ দূষণ রোধ, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও সুশাসন দরকার। এক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যেমন নীতি-কৌশল ও আইনগত ভিত্তি দরকার একই সঙ্গে সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে শক্তিশালীকরণ ও নিষ্ঠাবান দক্ষ জনবলও প্রয়োজন। সুশাসনের অন্যতম স্তম্ভ হলো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা। আইন সবার জন্য সমান হবে। বিত্তশালীরা ক্ষমতার জোরে আইনের প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে পরিবেশ দূষণ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং প্রশাসনকে প্রভাবমুক্ত হয়ে একযোগে কাজ করতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যদি তাদের অর্পিত দায়িত্ব দক্ষতার ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পালন করে তাহলে একদিকে যেমন গণতন্ত্র ও সুশাসনের দিকে আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ ও নাগরিক সুবিধাও বৃদ্ধি পাবে। বস্তুত দেশের সাধারণ নাগরিক এ বিষয়ে সচেতন হলে এবং সক্রিয় উদ্যোগ নিলেই দূষণ রোধ ও পরিবেশ সংরক্ষণে বাধা দ্রুত দূর হবে। আর সাধারণ মানুষ তার ভোটের অধিকার ব্যবহার করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।

সরকার একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণ করতে চায় তেমনি দারিদ্র্য নিরসন ও টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতেও যথেষ্ট আগ্রহী। বিভিন্ন পরিবেশ নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের দুর্বলতা সরকারের এই গতিকে বাধাগ্রস্থ করছে। পরিবেশ অধিদফতরের জনবল এবং আইনি কাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে। পরিবেশ দূষণ রোধে ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে ব্যবসা, বাণিজ্য, শিল্পায়ন, নগরায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতায় আসতে হবে। সবাই যেন আইন মেনে চলে তার জন্য সরকারকে কার্যকর ও শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। দূষণরোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সচেতন নাগরিক সমাজকেও  উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবেশ বিষয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা তথা দেশে পরিবেশ আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়নে এই অধিদপ্তরের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে এর যে ভূমিকা ও পরিসর তাকে  শক্তিশালী ও আধুনিক করতে হবে।বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নকল্পে বর্তমানে প্রায় ২০০টি আইন বিদ্যমান রয়েছে। ২০০৪ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ দূষণের কারণে প্রায় ৯০০টি শিল্প কলকারখানার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেও কারো বিপক্ষেই মামলা করা হয়নি কিংবা কোনো সাজাও হয়নি। পরিবেশ রক্ষায় আমাদের যেমন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রয়েছে তেমনি রয়েছে সঠিক এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার অভাব। এছাড়া পরিবেশ সংক্রান্ত যুগোপযোগী নতুন নতুন আইনের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সঠিকভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম সফলভাবে এগিয়ে যাবে।  আর যদি বিশেষ কোনো বিষয়ে আইন না থাকে সেক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের সাহায্যে নতুন করে আইন প্রণয়ন ও তার উপযুক্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে ।

পরিবেশ  জীবনেরই অংশ। মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও পরিবেশকে এক সুরে বাঁধতে না পারলে যত উন্নয়ন কর্মই করা হোক না কেন তা কল্যাণকর কিছু বয়ে আনতে পারবেনা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সমৃদ্ধির সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত করে শুধু আজকের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করা অর্থহীন। কাজেই পরিবেশ সুরক্ষাই হচ্ছে টেকসই উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি যার বাস্তবায়ন সম্ভব একমাত্র পরিবেশ সুশাসনের মাধ্যমে।সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য’র আলোকে বাংলাদেশ সরকার যে কৌশলপত্র তৈরি করেছে তাতে সুষ্পষ্টভাবে পরিবেশ তথা প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে। কাজেই এই দুটোর সমন্বয়ে পরিবেশ সুরক্ষা বা পরিবেশ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুশাসন বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজ, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ করে স্থানীয় সরকারকে সাথে নিয়েই এগোতে হবে।তাই আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বাস্তবায়নের জন্য পরিবেশের প্রেক্ষিতে সুশাসন নিয়ে ভাবতে হবে এখন থেকেই।

লেখক

শিক্ষার্থী, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Check Also

জলবায়ু পরিবর্তনঃ যে ৯ টি কারণে ২০১৮ তে আমরা আশাবাদি হতেই পারি!

সাদিয়া লেনা আলফি গেল বছরটি ছিলো জলবায়ুর জন্য বেশ আশঙ্কাজনক। বিষয়টি মূলত ঘটেছে বর্তমান বিশ্বের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *