ধূলা দূষণকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি পবা’র

বর্তমানে ঢাকা মহানগরীতে ধূলা দূষণ প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। আর এই দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। গত মঙ্গলবার বিশ্বজুড়ে একযোগে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিকবায়ু পরিস্থিতি-২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বলা হয়েছে। আর বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যু হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। পিএম ২.৫ ছাড়াও বায়ুর অন্যান্য দূষণকারী পদার্থের উপস্থিতির দিক থেকে সামগ্রিক দূষণের একটি চিত্র ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার ২০১৭, সকাল ১১ টায়, শাহাবাগস্থ ঢাবি’র চারুকলা অনুষদের সামনে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)-র উদ্যোগে ”ধুলা দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ চাই” দাবীতে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়েছে। উক্ত মানববন্ধনে বিভিন্ন পেশাজীবী, পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ আরও অনেকে অংশগ্রহণ করেন।
পবা’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খানের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, সহ-সম্পাদক মো. সেলিম, পবা’র সদস্য ক্যামেলিয়া চৌধুরী, সুবন্ধন সামাজিক কল্যাণ সংগঠন-এর সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব, পল্লীমা গ্রীণ-এর সদস্য সচিব আনিসুল হোসেন তারেক, পুরান ঢাকা নাগরিক উদ্যোগের সভাপতি নাজিম উদ্দিন, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট-এর প্রকল্প কর্মকর্তা আতিকুর রহমান, স্বচেতন নগরবাসী’র সভাপতি জিএম রোস্তম খান, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, ইয়ুথ সান-এর সভাপতি মাকিবুল হাসান বাপ্পী, স্থপতি শাহীন আজিজ, আমিনুল ইসলাম টুব্বুস, নগরবাসী সংগঠনের সভাপতি হাজী শেখ আনসার আলী প্রমুখ।
পবা’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান তার বক্তব্যে বলেন, বাতাসে নানা পদার্থ বায়বীয় অবস্থায় অবস্থান করে, যার প্রতিটির একটি সহনীয় মাত্রা থাকে। এর মাঝে কিছু মানব বা জীবজগতের জন্য প্রয়োজনীয় এবং কিছু বিপজ্জনক। এ সকল পদার্থের সহনীয় মাত্রার কম-বেশী হলেই আমরা তাকে বায়ূ দূষণ বলি। অন্যান্য পদার্থের মধ্যে ভাসমান ধূলিকণাও বায়ূর একটি অন্যতম উপাদান। একটি ধূলিকনার আকার ১০ মাইক্রোনের বেশী হলেই তা বায়ূতে ভেসে বেড়াতে পারে না। ছোট আকারের ধূলি কনাই বায়ূ দূষণ ঘটায়। প্রতি ঘণমিটার বাতাসে এরকম ২০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত ধূলিকণা স্বাভাবিক বলে ধরা হয়; তার বেশী হলেই তাকে ধূলা দূষণ বলা হয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের সম্প্রতি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্বের দূষিত বায়ূর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। বর্তমানে ধূলা দূষণ প্রকট আকার ধারণ করেছে। ধূলা দূষণে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ধূলাজনিত রোগব্যাধির প্রকোপ। রাস্তার পাশে দোকানের খাবার ধূলায় বিষাক্ত হচেছ প্রতিনিয়ত। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে রোগ জীবানু মিশ্রিত ধূলা ফুসফুসে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানী ও যক্ষ্মা সহ নানা  জটিল রোগের সৃষ্টি করছে। আক্রান্ত হচ্ছে শিশুসহ সব বয়সের মানুষ, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য একটি মারাত্বক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ধূলার কারণে দোকানের জিনিসপত্র, কম্পিউটারসহ নানা ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ঘরবাড়ি আসবাবপত্রসহ কাপড় চোপড়ে ধূলা জমে যেভাবে প্রতিদিন নগর জীবনকে নোংরা করছে, তা পরিচ্ছন্ন রাখতেও নগরবাসীকে নষ্ট করতে হচ্ছে হাজার হাজার শ্রমঘণ্টা ও বিপুল পরিমাণ পানি এবং ডিটারজেন্ট। সর্বোপরি শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের শারীরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকয় তারা সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে ধূলাজনিত রোগ, বালাই-এ। এই সর্বগ্রাসী ধূলা দূষণে নগরবাসী অতিষ্ঠ। অবিলম্বে ধূলা দূষণ বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরী। আমরা এর থেকে পরিত্রাণ চাই, সুস্থ্য হয়ে বাঁচতে চাই।
তিনি বলেন, শীত আসলেই ঢাকা মহানগরীতে ধুলা দূষণের প্রকোপ অত্যন্ত বেড়ে যায়। কারণ শুষ্ক মৌসুমে হাজার হাজার ইটের ভাটার পাশাপাশি মহানগরীতে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, ড্রেনেজ এবং রাস্তাঘাট উন্নয়ন ইত্যাদি সেবামূলক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাস্তা-ঘাট খোঁড়া-খুঁড়ির পরিমান বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া নিয়ম না মেনে মাটি, বালুসহ অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রী দীর্ঘদিন যত্রতত্র ফেলে রাখা, রাস্তার দু’পাশে ময়লা আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা, পুরাতন ভবন ভাঙ্গা, নতুন ভবন তৈরীর ইট-বালু-পাথর, মেশিনে ইট ভাঙ্গা, উড়াল সেতু নির্মাণ, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ধোঁয়া ধূলা দূষণের প্রধান কারণ। জীবণুমিশ্রিত ধুলায় শ্বাসকষ্ট, হাঁপানী, এলার্জি, চর্মরোগসহ নানা রোগব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়াও ধুলা দূষণের ফলে
বাসা বাড়িসহ দোকানের মূল্যবান জিনিস দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং এসব পরিষ্কার করতে প্রতিদিনকার মূল্যবান সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করতে হয়। ধুলা দূষণের ফলে সালোকসংশ্লেষণ বাধাগ্রস্থ হয়ে গাছপালার বৃদ্ধি ও ফলন ব্যাহত হচ্ছে। ধুলা দূষণে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হচ্ছে তেমনি আর্থিক ও পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় অবিলম্বে ধুলা দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরী।
তিনি বলেন, ধূলা দূষণের প্রতিরোধে, পরিবেশ আইন অনুসারে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধূলা দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য করা; ধূলা দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ; নিয়মিত রাস্তা পরিষ্কার করা, সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক আবর্জনা সংগ্রহ ও পরিবহনের সময় যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা। ধূলা দূষণ বন্ধে সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। ধূলা দূষণ নিয়ন্ত্রণে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ধূলা দূষণের উৎসসমূহ বন্ধ করতে হবে। পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের লাইনের খোড়াখুঁড়ির সময় যাতে ধূলা দূষণ না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। ভবন নির্মাণ এবং ভাঙ্গার সময় যথাযথ নিয়ম মেনে তা করতে হবে। ড্রেনের ময়লা এবং রাস্তা ঝাড়– দিয়ে ময়লা আবর্জনা জমিয়ে না রেখে সাথে সাথে অন্যত্র অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। তা জমিয়ে না রেখে গৃহস্থালী ও বাজারের ময়লা সঠিক নিয়মে দ্রুত সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ময়লা পরিবহণের গাড়িগুলোতে ভালোভাবে আচ্ছাদিত করে ময়লা পরিবহণ করতে হবে। ধূলা দূষণের সাথে জড়িত দায়ী ব্যাক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সর্বোপরি ধূলা দূষণের সকল উৎস বন্ধে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রয়োজনে লোকবল বৃদ্ধি ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে হবে। সিটি কর্পোরেশন, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনিটরিং বৃদ্ধি করতে হবে এবং দায়িত্বে অবহেলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে।
মানববন্ধন থেকে উক্ত দাবিগুলো তুলে ধরা হয়ঃ
* যানবাহন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নত মানের জ্বালনী আমদানি ও ব্যবহার করতে হবে।
* ইট প্রস্তুতে আধুনিক প্রযুক্তি ও লো সালফারযুক্ত কয়লা ব্যবহার করতে হবে।
* পরিসেবা প্রদানকারী সংস্থাসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে সকল পরিসেবা কার্যক্রমের জন্য রাস্তা একবার খনন করা। পরিসেবার সম্প্রসারণ, সংযোগ, মেরামত ও নতুন সংযোগ স্থাপনের সময় রাস্তা খননকৃত মাটি সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে ফেলা এবং দ্রুত রাস্তা মেরামত করতে হবে।
* রাস্তাঘাট ও ফুটপাত নিয়মিত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও মেরামত করতে হবে।
* ভবন নির্মাণ ও মেরামত বা অন্য যে কোন অবকাঠামো নির্মাণের সময় নির্মাণ সামগ্রী রাস্তার উপর বা রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় না রাখা ব্যবস্থা করতে হবে।
* ধূলা সৃষ্টি করে এমন কোন সামগ্রী (বালু, মাটি, ইট, পাথর) বহনের সময় সঠিক আচ্ছাদন ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে।
* নালা-নর্দমা পরিস্কার করার পর আবর্জনা রাস্তার পাশে জমিয়ে না রেখে দ্রুততম সময়ে সরিয়ে নিতে হবে।
* সকল আবর্জনা যথাযথ স্থানে ফেলা, সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক আবর্জনা সংগ্রহ ও পরিবহনের সময় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাতে যানবাহন থেকে আবর্জনা রাস্তায় ছড়িয়ে না পড়ে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।
* কারখানার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
* ধূলা দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনসমূহ বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সকল সকল কর্তৃপক্ষকে তাদের উপর অর্পিত আইনানুগ দায়িত্ব আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, সততা ও স্বচ্ছতার সাথে পালন করতে হবে।
* ধূলা দূষণ ও এর ক্ষতিকর প্রভাব বিষয়ে নাগরিক সচেতনা বৃদ্ধির জন্য সরকার ও বেসামরিক সংগঠন, সংবাদ মাধ্যম এবং সচেতন মহলের যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

Check Also

ইকো ফেস্টিভ্যাল ২০১৭; চলছে পরিবেশের জন্য আলোকচিত্র প্রদর্শনী !

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে চলছে তিনদিন ব্যাপী 'ইকো ফেস্টিভ্যাল ২০১৭'। পরিবেশের জন্য আয়োজিত এই আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে ঘুরে আসার আমন্ত্রণ রইল সবার প্রতি...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *