বাংলাদেশে বিলুপ্তপ্রায় চাইনিজ বনরুই; আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে গবেষণাপত্র প্রকাশিত

ফারজানা হালিম নির্জন

বলা হয়ে থাকে, বনরুই (প্যাঙ্গোলিন) পৃথিবীর অন্যতম শীতল স্বভাবের একটি প্রাণি। আমাদের চারপাশে এমন কিছু মানুষের উপস্থিতি খেয়াল করি না মাঝে মাঝে, যারা কারো আগেও নেই, পাছেও নেই, নির্বিকার নিজের মত আনন্দ ছড়িয়ে শান্ত-স্নিগ্ধ এক জীবন পার করে দেয়! বনরুই এর স্বভাব অনেকটা সেরকম। অথচ, পৃথিবী থেকে এই শান্ত-শীতল প্রাণিটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে চলেছে। তবে, আমাদের জন্য আশীর্বাদের মত একটা খবর হলো, বাংলাদেশে এই বিলুপ্তপ্রায় প্রাণির বসবাস রয়েছে। কিন্তু, এখানে এই অমূল্য প্রাণিটি ঠিক কেমন জীবন-যাপন করছে, চলুন জেনে আসি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন অভিজ্ঞ মুরং শিকারীর কাছ থেকে শোনা, ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোট ৩২ টি বনরুই তিনি একাই শিকার করেছেন। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে মাত্র ২ টি শিকার করেছেন। এ থেকে বেশ সহজভাবেই আন্দাজ করা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস করা বনরুই-এর সংখ্যা স্পষ্টত কমে এসেছে অথবা প্রায় নেই বললেও খুব একটা ভুল হবেনা হয়তো ! পড়ছিলাম একটি আন্তর্জাতিক সাময়িকী তে প্রকাশিত বাংলাদেশের বনরুই সম্পর্কিত একটি গবেষণা পত্র। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণি ও পরিবেশ সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ক্রিয়েটিভ কঞ্জারভেশন অ্যালায়েন্স’ (সিসিএ) বেশ দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিমুহুর্তে। প্রতিনিয়ত তাঁদের নিত্য নতুন গবেষণার কথা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাময়িকী তে প্রকাশ পাচ্ছে। সম্প্রতি ৭ এপ্রিল, ২০১৭ তে বাংলাদেশে বনরুই (প্যাঙ্গোলিন) গবেষণার একটি বিস্তর ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। কী ছিলো বা কী আছে, কতটুকু হারিয়েছি আর কতটুকুই বা সচেতন হতে পারি বর্তমান নিয়ে, সবকিছুর যুগপৎ ঘটিয়ে বাংলাদেশে বনরুই এর একটা সুস্পষ্ট ধারণা পেতে পারেন প্লস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত অনুচ্ছেদটি পড়ে !

সিসিএ-এর প্রতিষ্ঠাতা শাহরিয়ার সিজার রাহমানের হাতে নিশ্চিন্ত-নিরাপদ আশ্রয়ে আছে একটি চাইনিজ বনরুই।

পরিবেশ সচেতন পাঠক, পার্বত্য চট্টগ্রামে বনরুই এর বর্তমান পরিস্থিতি হতাশাজনক হলেও, গবেষকগণ লাউয়াছড়ার মাটিতে বিভিন্ন গর্তে উঁকি মেরে তুলনামূলক আশার আলো বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছেন। লাউয়াছড়ায় চালানো বিভিন্ন গবেষণার ফল বলছে, এখানে এখনো তুলনামূলক বেশ সংখ্যক বনরুই নীরবে বসবাস করছে। এমনকি চা-বাগানের শ্রমিকরা জানিয়েছেন, মনোকালচার টি স্টেটে বনরুইদের সাক্ষাৎ প্রায়ই পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, চমৎকার জীব-বৈচিত্র্যের ঠিকানা এই বাংলাদেশ থেকে বনরুই এর পরিমাণ দিন দিন কমে আসছে কেন ! বনরুই-এর উদাহরণ সামনে রেখে বাংলাদেশে বন্যপ্রাণিদের দেখভাল সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, এই বিষয়ে একটু কি খটকা লাগছে না?
আরেকটু ভালোভাবে এই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার জন্য চলুন গবেষণা পত্রের আলোকে একটু আগা-গোড়া জেনে নেই বনরুই সম্পর্কে…

বনরুই- হল স্তন্যপায়ী প্রানিদের মধ্যে ‘ফোলিডোটা’ বর্গের অন্তর্গত একটি প্রানি। বিশ্বব্যাপী এদের মোট আটটি প্রজাতি আছে, যার মধ্যে ৪ টি এশিয়াতে আর বাকি ৪টি আছে আফ্রিকা মহাদশে। কিন্তু বিলুপ্তির পথে হাঁটবার পেছনের কারণটা কী ! উত্তর লুকিয়ে আছে এদের নামেই।

মূলত রুইমাছের মতন এদের দেহে আঁশ থাকে বলেই এদের বনরুই বলা হয়। এই আঁশগুলো মূলত কেরাটিন নির্মিত আর এই আঁশ সহ মাংসের জন্যেই এদের শিকার করা হয়। এটিই প্রধাণ কারণ, যার জন্য এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে বিলুপ্তির প্রহর গুনছে পরিবেশের সাথে লড়াই করে টিকে থাকা বাদ-বাকি বনরুইয়েরা।

চাইনিজ বন্রুই ঠিক যেভাবে গর্ত খুঁড়ে নিজের আবাসস্থল বানায়

বিভিন্ন গবেষনাপত্র ও বইয়ের আলোকে গবেষক দল জানতে পারেন, বাংলাদেশে এক সময় তিন ধরনের বনরুই পাওয়া যেত যার মধ্যে- চাইনিজ বনরুই, ইন্ডিয়ান বনরুই আর সুন্দা বনরুই আছে। যদিও তৎকালীন সময়ে এই তথ্যের নিরীখে কোন ধরনের ছবি বা স্পেসিমেন ভাউচার মেলে নি। অনেক ক্ষেত্রে ছবি বা স্পেসিমেন ভাউচারের ক্ষেত্রে ভুল নামকরনের ঘটনাও ঘটেছে। গবেষকগণ স্পষ্টত এ ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, হয়তো ইন্ডিয়ান এবং সুন্দা বনরুই কখনোই এখানে ছিলো না, হয়তো বা তাঁদের ভুল নামকরণ করা হয়েছিলো তখন। তবে চাইনিজ বনরুই-এর পরিমাণ বরাবরই অনেক বেশি ছিলো এবং এখনো কিছু আছে, এ ব্যাপারে যথেষ্ট প্রমাণ আছে, কোনো কিন্তু নেই !

এইসব কিছু আমলে নিয়ে তাঁরা এই বনরুই’এর উপর প্রাথমিক একটা গবেষনা কাজ চালান। এ উদ্দেশ্যে তাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্যামেরা ট্র‍্যাপ, ইন্টারভিউ সার্ভে করেন,  একইসাথে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে একটি মাঠ পর্যায়ে জরিপ কাজ চালান। উভয় ক্ষেত্রেই মুরং জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা শিকারী ছিলেন, তাঁদের ঐতিহ্যগতভাবে অনুসরণ করে আসা বন্যপ্রাণি বিষয়ক জ্ঞানকে ব্যবহারের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে বনরুই’র জরিপ কাজটা করা হয়। তখনই সর্বপ্রথম লাউয়াছড়াতে চাইনিজ বনরুই-এর সন্ধান পান তাঁরা। পর্যায়ক্রমে গবেষণার পরিধি বাড়তে থাকে, আর ফলাফল জানায় যে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বনরুই এর সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। বিশেষ করে ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল- এই সময়ের ভিতরে প্রচুর পরিমাণে এই প্রাণি শিকার হত। মূলত চীনে বনরুই আঁশ ও মাংস থেকে বিভিন্ন ঔষধ তৈরি করার জন্যই আমাদের এখানে বনরুই শিকার হত খুব বেশি। ১ কেজি ওজনের একেকটি বনরুই-এর দাম বাংলাদেশি মূল্যে প্রায় ২০,০০০ – ৩২,০০০ টাকা, ভাবা যায় !

এছাড়া ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয়  গনমাধ্যমে আসা বনরুই সংক্রান্ত খবর থেকে তাঁরা বাংলাদেশের আরো ৫টি এলাকাতে বনরুই-এর উপস্থিতির ব্যাপারে নিশ্চিত হন। ছবি দেখে তাঁরা নিশ্চিত হন, এইসব বনরুই হচ্ছে ‘চাইনিজ বনরুই’ প্রজাতির। এই গবেষনাকাজে উঠে আসে, বাংলাদেশের মোট ১১টি স্থানে বনরুই-এর বসবাস রয়েছে আর এইসকল প্রজাতি হচ্ছে চাইনিজ বনরুই।

বাংলাদেশের যেসব স্থানে বনরুই-এর সন্ধান পাওয়া গেছে

এখান থেকে মোটামুটি ধারণা করা যায়, চাইনিজ বনরুই ছাড়া যেসকল বনরুই আমাদের দেশে ছিল বলে ধারণা করা হয়, সেগুলো হয় বিলুপ্ত হয়ে গেছে অথবা পারতপক্ষেই ভুলভাবে এদের নামকরণ করা হয়েছে। তবে, উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া শতভাগ নিশ্চিত হয়ে কিছুই বলা যায় না, তাই এই ব্যাপারে গবেষকদল বর্তমানে একটি মাঠ পর্যায়ে জরিপ শুরু করেছে। পেছনের উদ্দেশ্যটা হচ্ছে, বাংলাদেশের যেসকল বনে পূর্বে বনরুই দেখা যেত সেসকল স্থানে জরিপের মাধ্যমে দেখা, সেখানে আসলেই এখনো এই প্রাণি টিকে আছে কি না ! হয়তো অচিরেই সেই তথ্য আমাদের সামনে হাজির হবে। গবেষকদের কাজ চলছে পুরো উদ্যমে, সেই সাথে চলতে থাকুক আমাদের মনের প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা। প্রচুর সম্ভাবনাময় নিয়ে আমাদের দেশ তৈরি, অথচ ঠিক ধরে রাখা যাচ্ছেনা ঠিকঠাক সুতোয়। হয়তো সেই সুতোটাই আমরা অবহেলায় হারিয়ে ফেলি পায়ের তলায়। নয়তো পৃথিবী থেকে বিলুপ্তপ্রায় এই বন্যপ্রাণিটির রক্ষণাবেক্ষণ কেন হুমকীর মুখে? তবুও আশা বেঁচে থাকে, আশার কথা শোনানোর দায়িত্বও নেয় কেউ না কেউ। জীব-বৈচিত্র্যে ভরপুর এই দেশটার নাম তাঁদের হাত ধরে পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

প্লস ওয়ান সাময়িকী তে প্রকাশিত অনুচ্ছেদটি পড়তে চাইলে এখানে  ক্লিক করুন।

Check Also

মৌসুমি ফলে বিষ দিয়ে নীরব গণহত্যা বন্ধের দাবি

মৌসুমী ফলের কুড়িঁ থেকে শুরু করে পাকা এবং বাজারজাত করন পর্যন্ত অত্যাধিক ও নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জনগণ গুরুতর স্বাস্থ সমস্যার উচ্চ ঝুকিতে রয়েছে। ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়ছে। এতে জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। রাসায়নিক বিষ মেশানো ফল খেয়ে মানুষ পেটের পীড়া, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, গ্যাস্ট্রিক, লিভার নষ্ট হয়ে যাওয়া, ক্যানসারসহ দীঘর্ মেয়াদি নানা রকম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *