আগামী ২ সপ্তাহে বাংলাদেশে কি ১৯৮৮ সালের মতো একটি বন্যা আসন্ন!

আবহাওয়া বিজ্ঞানের উপর বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত তথ্য মাধ্যম গুলোর বন্যা পূর্বাভাষ মডেল হতে প্রাপ্ত চিত্র, কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ হতে প্রাপ্ত বায়ু প্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের near real time চিত্র, আগামী ৩ দিনের বৃষ্টিপাত পূর্বাভাসের বিভিন্ন চিত্র ব্যবহার করে আবহাওয়া বিজ্ঞানের উপর নিজের অর্জিত সকল জ্ঞান প্রয়োগ করে বাংলাদেশে আগামী ২ সপ্তাহ সম্ভব্য যে বন্যার চিত্র কল্পনা করছি সেটা আসলেই ভয়ংকর।
উপরোক্ত প্রশ্নের উদ্রেক হতো না যদি না ঘুম থেকে উঠে ছোট ভাইয়ের ফেসবুক ওয়াল থেকে জানতে পারতাম যে আমাদের এলাকার প্রায় ১৫০ জন মানুষ নিজেদের বারি-ঘর ছেড়ে স্কুলে অশ্রয় নিয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার ৩ টি জেলা বাদ দিলে সমুদ্র সমতল থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু স্থানে অবস্থিত নীলফামারী জেলাটি। নির্দিষ্ট করে ১৯৮৮ সালের বন্যার কথা বলা এই কারণে যে ১৯৮৮ সালের বন্যা ব্যতীত গত ৩০ বছরে সংঘটিত অন্য কোন বন্যায় আমাদের এলাকার কোন মানুষে নিজের বাড়ি-ঘড় ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয় নি। ১৯৮৮ সালের বন্যাটি আমার নিজের চোখে দেখা। দাদা ছিলেন জনপ্রতিনিধি। বন্যা উপদ্রুত মানুষদের জন্য আসা ত্রাণ বিতরণ করা হতো আমাদের বাড়ির উঠান হতে। শৈশবে আমার নিজের ঘুমানোর ঘরটি ছেড়ে দিতে হয়েছিল বন্যার জন্য আসা ত্রাণের গোডাউন হিসাবে। বন্ধু ও ছোট ভাই এর দেওয়া ছবি দেখে নিশ্চিত করেই বলতে পারি এবারের এই বন্যার পানি ১৯৮৮ সালের ঐ বন্যার অবস্থা ছাড়িয়ে গেছে।
নিচে বেশ কিছু আবহাওয়া চার্ট (প্রাপ্ত বায়ু প্রবাহ, বৃষ্টিপাত, বন্যা পূর্বাভাস, নদীর প্রবাহ, বন্যা উপদ্রুত এলাকার ম্যাপ) যোগ করে দিচ্ছি। বন্ধুলিস্টে অনেক সাংবাদিক আছেন। আশা করছি জান ও মালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিষয়টির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিবেন। আপনাদের কোন তথ্যের প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবেন নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা অনুসারে চেষ্টা করবো আপনাদের সর্বোচ্চ নির্ভরযোগ্য তথ্য ও চিত্র দেওয়ার জন্য।
National Oceanic and Atmospheric Administration (NOAA) কর্তৃক পরিচালিত Color-enhanced Global Winds Visualization সাইট থেকে রিয়েল টাইম বায়ু প্রবাহের চিত্র
National Oceanic and Atmospheric Administration (NOAA) কর্তৃক পরিচালিত Color-enhanced Global Winds Visualization সাইট থেকে রিয়েল টাইম বায়ু প্রবাহের চিত্রে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম দিকের জেলা বৃহত্তর দিনাজপুর এলাকায় স্থল ভাগের উপর মৌসুমি বায়ু প্রবাহের যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে (ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের মতো) তা দেখা যায় বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় এর সময়। এই বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে ঠিক হিমালয় পর্বতের কোল ঘেঁষে। ফলে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হচ্ছে ঐ এলাকায়। আমেরিকার National Oceanic and Atmospheric Administration (NOAA) কর্তৃক পরিচালিত Regional and Mesoscale Meteorology Branch ও জাপানের আবহাওয়া উপগ্রহ Himawari-8 দ্বারা সংগ্রহীত চিত্র।
ছবি: কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত Infrared (IR) satellite imagery (which depicts the temperature of the clouds) যা মেঘের তাপমাত্রা নির্দেশ করছে (কৃতজ্ঞতা: Himawari-8 Imagery)
মানুষের জ্বর হলে যেমন শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয় থার্মোমিটারের সাহায্যে তেমনি ভাবে মেঘের মাথার তাপমাত্রা পরিমাপ করা হয় কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহে স্থাপিত সেন্সর (এক প্রকার থার্মোমিটার) এর সাহায্যে। Infrared (IR) satellite imagery (which depicts the temperature of the clouds) মেঘের তাপমাত্রা নির্দেশ করছে। ভূ-পৃষ্ঠের বিভিন্ন অবজেক্টকে বুঝার সুবিধার্থে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত visible satellite imagery কে False color দেওয়া হয় বাংলা সিনেমার নায়ক সাকিব খান যেমন লাল লিপিষ্টিক লাগায় ঠোট লাল দেখানোর জন্য (হে হে হে)। মানুষের শরীরের তাপমাত্রা ৯৮ ডিগ্রী ফারেনহাইট এর উপরে যত বেশি হবে তা যেমন শারীরিক অবস্থার তত অবনতি নির্দেশ করে। বিপরীত-ক্রমে মেঘের চাঁদির তাপমাত্রা যত বেশি ঋনাত্নক হবে সেই মেঘ তত বেশি শক্তিশালী বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। মেঘের চাঁদির তাপমাত্রা দেখে মেঘের উচ্চতা পরিমাপ করা হয়ে থাকে। বেশি ঋনাত্নক তাপমাত্রা উঁচু মেঘের নির্দেশ করে। নিচের স্কেল থেকে মেঘের তাপমাত্রা দেখে নিতে পারেন।
বায়ুর প্রবাহের এই দিক, মেঘের অবস্থান ও বৃষ্টিপাতের চিত্র পুরো-পুরি মিলে যাচ্ছে জাপানের আবহাওয়া উপগ্রহ Himawari-8 হতে প্রাপ্ত (Shortwave Infrared 3.9 μm imagery (brightness temperatures)) চিত্র থেকে।
Tropical Rainfall Measuring Mission (TRMM) নামক সংস্থা অনেকগুলো কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত বৃষ্টিপাতের চিত্র যোগ করে বৃষ্টিপাতের পূর্ণ একটি ম্যাপ প্রস্তুত করে প্রতি ৩ ঘণ্টার ও ৭ দিনের। ওয়েবসাইটে পাশাপাশি চিত্রে দেখা যাচ্ছে গত ৩ ঘণ্টা ও গত ৭ দিনের সর্বমোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ। https://trmm.gsfc.nasa.gov/publicat…
গত ৭ দিনের বৃষ্টিপাতের চিত্র হতে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের জেলা ও সন্নীহীত ভারতের এলাকা গুলোতে (দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, সিকিম) গুলোর উপর ৭০০ মিলিমিটারের অধিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে তিস্তা বাধের উজানে ভারতের গজল ডোবা বাঁধ খুলে দিতে বাধ্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ঐ সকল স্থানে পতিত বৃষ্টিপাত দিনাজপুর জেলার আত্রাই নদী, নীলফামরি, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী, ময়মনসিংহ ও জামালপুর জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত ব্ৰহ্মপুত্ৰ নদের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে যমুনা নদীতে মিলিত হবে। ফলে বর্তমান সময়ে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলায় সংঘটিত বন্যার পানি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশের মধ্যভাগে প্রবেশ করবে। ফলে বন্যার অবনিতি হবে সেটা হলফ করেই বলা যায়।
আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার এর Tropical Rainfall Measuring Mission (TRMM) এর ওয়েবসাইটে বাংলাদেশে বন্যা উপদ্রুত এলাকার নিম্নোক্ত চিত্রটি পাওয়া যাচ্ছে।
আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার এর Tropical Rainfall Measuring Mission (TRMM) এর ওয়েবসাইটে বর্তমান সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চলমান বৃষ্টিপাত, বন্যায় আক্রান্ত এলাকা ও অতিবৃষ্টির কারণে ভূমিধ্বস এর সম্ভাবনা আছে এমন এলাকার মানচিত্র পাওয়া যায়। এই সাইটে বাংলাদেশে বন্যা উপদ্রুত এলাকার নিম্নোক্ত চিত্রটি পাওয়া যাচ্ছে।
আমেরিকার আমেরিকার University of Maryland এর Global Flood Monitoring System ওয়েবসাইট (১০ নম্বর লিংক) হতে সারা বিশ্বের বৃষ্টিপাত, বন্যা, নদীর প্রবাহ এর চিত্র পাওয়া যাবে (বর্তমান সময়ের ৩ ঘণ্টা পূর্ব পর্যন্ত; অর্থাৎ, দুপুর ১২ টায় পাওয়া যাবে সকাল ৯ টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত এর চিত্র)। এখানে উল্লেখ্য যে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত কৃত্রিম উপগ্রহ হলো Global Precipitation Measurement (GPM)।
Extreme Rainfall Detection System (http://erds.ithacaweb.org/ ) পোর্টাল থেকে রিয়েল টাইম সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের আগামী ২৪ ঘণ্টা (১ দিন), ৭২ ঘণ্টা (৩ দিন) ও ১৪৪ ঘণ্টা (৬ দিন) এর বন্যার পূর্বাভাষ পাওয়া যাবে। একই সাথে নির্দিষ্ট বন্যার ফলে ঐ এলাকায় কি পরিমাণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই সংখ্যাও পাওয়া যাবে। আর একটি তথ্য পাওয়া যাবে এই পোর্টাল থেকে তা হল ঐ সকল স্থানে সম্ভাব্য মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ। কোন স্থানে কোন ধরনের বন্যা হবে (সাধারণ, মধ্যম ও প্রচণ্ড) তা ৩ টি কালারের মাধ্যমে নির্দেশ করা হয়ে থাকে। এই পোর্টালটি ইতালির Information Technology for Humanitarian Assistance, Cooperation and Action (সংক্ষেপে ITHACA) নামক একটি সংস্থা পরিচালনা করে থাকে। UN World Food Programme (WFP) এই পোর্টালের তথ্য ব্যবহার করে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অতি বৃষ্টি ও বন্যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের মধ্যে রিলিফ বিতরণ করে থাকে।
আগামী ২৪ ঘণ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ২০০ মিলিমিটার এর অধিক বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাষ করে হয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম শহরে চলমান জলাবদ্ধতার আরও অবনতি হবে তাই নিশ্চিত করেই বলা যায়।
Extreme Rainfall Detection System (ERDS) পোর্টাল থেকে রিয়েল টাইম সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্হানের আগামী ২৪ ঘন্টা (১ দিন) এর বন্যার পূর্বাভাস
আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারতের মেঘালয় জেলায় ৩০০ মিলিমিটার এর অধিক বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস করে হচ্ছে। ফলে ঐ বৃষ্টি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের হাওর এলাকায় চলমান বন্যার আরও অবনতি ঘটাবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
Extreme Rainfall Detection System (ERDS) পোর্টাল থেকে রিয়েল টাইম সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্হানের আগামী ২৪ ঘন্টা (১ দিন) এর বন্যার পূর্বাভাস
উত্তর-পূর্ব ভারতের যে এলাকা গুলোতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে (ভারতীয় দিনাজপুর, বিহার রাজ্য) তার পানি ফারাক্কা বাধের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হবে। ভারত ফারাক্কা বাধের অনেক গুলো গেট খুলে দিতে বাধ্য। ফলে পদ্মা নদীর পানি রাজশাহী অঞ্চলেও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে।
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের স্থল ভাগের ৩ দিকেই প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হচ্ছে ও আগামী ২৪ ঘণ্টায় হবে। ঐ সকল বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট পানি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশের বন্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটাবে। এর চেয়ে বেশি কিছু লেখা হতে আপাতত বিরত থাকলাম।
বন্ধু লিস্টে অনেক সাংবাদিক আছে। আশা করছি জান ও মালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিষয়টির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিবেন। আপনাদের কোন তথ্যের প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবেন নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা অনুসারে চেষ্টা করবো আপনাদের সর্বোচ্চ নির্ভরযোগ্য তথ্য ও চিত্র দেওয়ার জন্য।
লেখকঃ মোস্তফা কামাল পলাশ,
গবেষক, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন
ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলু, কানাডা।

Check Also

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনের নিরবতাই চিকুনগুনিয়ার ব্যপকতার জন্য দায়ী

১৯৫২ সালে প্রথম তানজানিয়ায় চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ৬০টি দেশে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে ২০০৮ সালে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের অস্তিত্ব ধরা পড়লেও এবছরের মে মাস থেকে তার প্রকোপ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *