সাগরতলে তুষারপাত!

সাদিয়া লেনা আলফি

শিরোনাম পড়ে ভ্রূ কুঁচকে যাচ্ছে? আসুন একটু আলাপে ডুব দেই! আবহাওয়া এবং জলবায়ুর উপর মহাসাগরীয় স্রোতের শক্তি প্রবাহ ক্ষমতার বেশ প্রভাব রয়েছে। সর্বজনবিদিত এই বিষয়টি ছাড়াও সাগরের প্রাণীকূলও জলবায়ুর উপর প্রভাব ফেলে থাকে। বিশেষ করে অতি ক্ষুদ্র প্লাঙ্কটনিক জীব সাগরের পৃষ্ঠভাগ হতে কার্বন আহরন করে, প্রক্রিয়াজাত করে, দেহগঠন করে এবং বর্জ্য পদার্থ নির্গমন করে। নির্গমনকৃত বর্জ্য পদার্থ এবং মৃত জীবাংশ বিশেষ ধীরে ধীরে সমুদ্র তলদেশে জমা হয়। জৈব পদার্থের গভীর সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়াকেই বিজ্ঞানীরা বলছেন সামুদ্রিক তুষারপাত!

সমুদ্র পৃষ্ঠদেশে যেখানে জৈবিক উপাদান বেশী,সেখানে তুষারপাত সবচেয়ে বেশী প্রকট। যদিও জৈব কনাগুলো কিভাবে সমুদ্র গভীরে বিস্তৃত এবং কোন প্রক্রিয়া বিস্তারে ভূমিকা পালন করে তা সঠিক জানা যায় না, GEOMAR Helmholtz Centre for Ocean Research  কতৃক চালিত একটি আন্ততর্জাতিক গবেষক দল প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের ৫০০০ মিটার গভীরে জৈবকণার ঘনত্ব ও বিস্তৃতি সংক্রান্ত উচ্চমানের তথ্য প্রকাশ করেছেন। GEOMAR এর জীববিজ্ঞানী ও প্রকাশনার প্রধান লেখক ডক্টর রেইনার কিকো বলেছেন, “তথ্য গবেষনা করে আমরা জানতে পেরেছি, গভীর সমুদ্রে কনার প্রবাহ সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের পুর্ববর্তী কিছু ধারনা কাজে লাগাতে হবে”।

ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক সমৃদ্ধ দলটি জার্মান গবেষনা জলযান মিটিওর এবং মারিইয়া এস মেরিয়ান, যুক্তরাষ্ট্রের রোনাল্ড এস ব্রাউন, এবং ফরাসী জলযান লারিয়ান্তে ও তারার বিভিন্ন সময়ে সমুদ্র অভিযান থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয় “Under Water Vision Profiler(UVP)” নামক সেন্সর দিয়ে। UVP হচ্ছে এমন একটি বিশেষ ধরনের ক্যামেরা যা কিনা সমুদ্রের ৬০০০ মিটার গভীরে যেতে সক্ষম এবং সেকেন্ডে ১০ টির বেশী ছবি তুলতে পারে এবং ক্ষুদ্র প্লাঙ্কটন শনাক্ত করতে পারে।

“এতদিন পর্যন্ত মনে করা হতো সমুদ্র পৃষ্ঠদেশে কণার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশী এবং তা গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে কমতে থাকে। কিন্তু আমাদের ডাটা বলছে, ৩০০ থেকে ৬০০ মিটার গভীরে কনাগুলোর ঘনত্ব বেড়ে যায়” বলেন ডক্টর কিকো। গবেষক দল বিষয়টিকে ব্যখ্যা করেন প্লাঙ্কটন গুলোর স্থান পরিবর্তনশীল আচরণ দিয়ে। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে প্লাঙ্কটন গুলো নির্দিষ্ট গভীরতায় ফিরে যায়।

মাইক্রোস্কোপিক কণাগুলো ৫০০০ মিটারের বেশি গভীরতায় ধীরে ধীরে জমা হয়। “এটিও আশ্চর্যজনক!” বলেন ডক্টর কিকো। “কারণ আমরা মনে করতাম বৃহদাকার, দ্রুত পতনশীল কনাগুলোই কেবল ১০০০ মিটার গভীরে পাওয়া যায়”।

বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার গবেষক সমন্বয়ে গঠিত এই দলটি আরো একটি ঘটনা ব্যখ্যা করতে পেরেছেন-বিষুবীয় অঞ্চলে কণা প্রবাহ বিষুবরেখা থেকে মাত্র ১০০ মিটার উত্তর বা দক্ষিন অঞ্চল থেকে অনেক বেশী। GEOMAR এর একজন সমুদ্রবিজ্ঞানী ডক্টর পিটার ব্র্যান্ড বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে “নিরক্ষরেখার উত্তর এবং দক্ষিণে পুর্বমুখী স্রোত প্রবাহের কারণে প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয় যা পরবর্তিতে জৈব কণার উত্তর-দক্ষিণমুখী চলনে বাধা প্রদান করে।

সর্বপরী বিজ্ঞানীরা আমাদের “বায়লজিকাল কার্বন পাম্পে” ভৌত ও জৈবিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। “অবশ্যই সমুদ্রে বিভিন্ন প্লাঙ্কটনিক গ্রুপের বিস্তার জানার জন্য ও UVP ইমেজ গুলোকে পরিমার্জন করার জন্য আমাদের আরো গবেষনা প্রয়োজন।“ যুক্ত করেন ড কিকো।

লেখক- শিক্ষার্থী

মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তথ্যসূত্রঃ সায়েন্স ডেইলি

Check Also

গবেষণায় পাওয়া গেলো প্রতিকূলতা সহিষ্ণু প্রবাল ‘কোরালিথ’

গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল বলছে, বালি এবং পাথরপ্রধান দূর্গম অঞ্চলগুলোতে খুঁজে পাওয়া প্রবালের আবাসস্থলগুলো কোরালিথ দ্বারা তৈরি। প্রতিকূল পরিবেশে কোরালিথের টিকে থাকার এই ক্ষমতা হুমকির সম্মুখীন প্রবালের বাসস্থান সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *