তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাস্তা রঙ !

লেনা আলফি

লস এঞ্জেলস এক অদ্ভুত শহর। বিশেষ করে হিমশীতল, ঠান্ডা আবহাওয়ার দেশ থেকে যারা প্রথমবার লস এঞ্জেলস ভ্রমনে যান, তাদের মনে প্রথম যে বিস্ময় জাগে তা হচ্ছে‌, এতো সবুজ! আসলেই তাই। তবে সবুজে ঘেরা অসাধারণ এ শহরের একটি সমস্যা হচ্ছে লস এঞ্জেলস প্রচুর পরিমাণে পানির উপর নির্ভরশীল। অসাধারণ এ সুন্দর শহরে কোন ঋতুর পরিবর্তন না হওয়ায় বেশীরভাগ সময়ই এটি থাকে উষ্ণ।

সে অর্থে লস এঞ্জেলস যতটা না সবুজ, ঠিক ততটাই ধূসর। এ শহর সম্পর্কে আর একটি সত্য হলো এখানে কেও হাঁটে না, গাড়িই যোগাযোগের মূল মাধ্যম। যদিও গাড়ি ব্যবহারে মানুষকে অনাগ্রহী করার জন্য শহর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে, তবুও লস এঞ্জেলসে খুব কম মানুষকেই হাঁটতে দেখা যায়।

এ অবস্থায় লস এঞ্জেলসের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে রাস্তায় পীচের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধি যা শহরের তাপমাত্রাও বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকগুণ। সিবিএস লস এঞ্জেলসের তথ্যমতে, শহরের রাস্তার পীচ সূর্যকিরণের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগ শোষণ করে গলতে শুরু করে। প্রচণ্ড রোদের তাপে পারদ যখন ১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রা ছুঁইছুঁই করে তখন এসব পীচের তাপমাত্রা প্রায় ৫০ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে। শুধু তাই নয় তখন এটি আশেপাশের পরিবেশ কেও যথেষ্ট উষ্ণ করে তোলে যা বসবাসকারীদের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়াও এটি শক্তি ব্যবহার যেমন ফ্যান এবং এয়ার কন্ডিশন ব্যবহার বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে, তৈরি হচ্ছে “শহুরে তাপীয় দ্বীপ” বা আরবান হিট আইল্যান্ড।

রাস্তায় দেয়া হচ্ছে কুলসিলের আস্তর। ছবিঃ লস এঞ্জেলস ব্যুরো অব স্ট্রীট সার্ভিস।

এর সমাধান কি হতে পারে?? নগর কর্তৃপক্ষ এর এক চমৎকার সমাধান বের করেছেন লস এঞ্জেলসের জন্য। আর তা হচ্ছে অ্যাস্ফাল্ট বা পীচের রাস্তাকে সাদা রঙে ঢেকে ফেলা!

লস এঞ্জেলস ব্যুরো অফ স্ট্রীট সার্ভিস সূত্রে জানা গেলো, গত বছরের গোড়ার দিকে এই রাস্তা রঙ করার প্রথা চালু হয়। প্রাথমিকভাবে এটি সফলতার মুখ দেখেছে। ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, পানিমিশ্রিত অফ হোয়াইট “কুলসিল” নামক এই ইমালশনটি সুর্য রশ্মি শোষণ না করে তা প্রতিফলিত করে; যা কিনা প্রচলিত পীচের মিশ্রণের চেয়ে রাস্তাকে ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রি বেশি ঠান্ডা রাখে। এই “কুলসিল” মূলত দুইটি আস্তরে প্রয়োগ করতে হয়। এটি দীর্ঘস্থায়ী এবং পানীরোধী হয়ে থাকে।

সান ফ্রান্সিস্কো ভ্যালিতে অনুষ্ঠিত পাইলট প্রোগ্রামে মূল রাস্তাগুলো “কুলসিল” দিয়ে আস্তরিত করা হয়েছিলো এবং দেখা গেছে এটি আশেপাশের আস্তরবিহীন রাস্তার চেয়ে প্রায় ২৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট পরিমাণ কম তাপ শোষণ করে।

ব্যুরো অফ স্ট্রিট সার্ভিসের এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর গ্রেগ স্পটস জানান, শহরগুলো সাধারণত আশেপাশের গ্রামাঞ্চল এলাকা থেকে বেশি উষ্ণ হয়ে থাকে, একে বলা হয় তাপীয় দ্বীপ প্রভাব বা ‘হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’ আমরা এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছি।

কুলসিলের আস্তর দেয়া সাদা রাস্তা। ছবিঃ লস এঞ্জেলস ব্যুরো অব স্ট্রীট সার্ভিস।

উষ্ণ দেশগুলোর জন্য পিচ প্রস্তুত করে এমন একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান গার্ডটপ’এর ন্যাশনাল সেলস ডিরেক্টর জেফ লুজার বলেন, “আমরা লস এঞ্জেলসকে যতটা সম্ভব শীতল বানানোর চেষ্টা করছি। আশা করি আমরা দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সবথেকে শীতল শহর হতে পারবো”।

ডেইলি নিউজের বরাতে জানা যায়, আরবান হিট আইল্যান্ডের কারণে লস এঞ্জেলসের তাপমাত্রা গত ১০০ বছরে বেড়েছে প্রায় ৫ ডিগ্রি। গ্রীষ্মে গড় তাপমাত্রা বেড়ে যায় আরো বেশি। এর কারণে শহর শীতলীকরণ প্রক্রিয়া, ঠাণ্ডা ছাদ এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীর প্রয়োজন হচ্ছে।

যদিও সিবিএস লস এঞ্জেলস জানিয়েছে, কালো পীচকে সাদা করতে খরচটাও নেহায়েত কম নয়। প্রতি মাইল রাস্তা “কুলসিল” আস্তরিত করতে খরচ পড়বে ৪০,০০০ ডলার। উপরন্তু এই আস্তর টিকবে কেবল সাত বছর।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পীচের উপর সাদা এই আস্তরণের উন্নতি এর দাম কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে। এছাড়াও এর ফলে ঘর শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার ব্যবহার কমবে। যেমন এয়ার কন্ডিশনের ব্যবহার কমার ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে। এছাড়াও সাদা আস্তরণের ফলে সন্ধ্যা হতেই রাস্তার বাতি জ্বালানো লাগছে না। এখানেও জ্বালানি শক্তির সাশ্রয় করা সম্ভব।

যদিও এই প্রশ্নটির মুখোমুখি হতেই হবে, যে এইসব পদ্ধতি ব্যবহার করে তাপমাত্রা কতটুকু কমানো সম্ভব?? উত্তর দিয়েছেন আরিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির আরবান ক্লাইমেট রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ডেভিড সেইলর “শহরকে শীতল করার জন্য শুধুমাত্র একটি পদ্ধতিই যথেষ্ট নয়। আমাদের নানামুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে”।

সূত্রঃ www.mnn.com

Check Also

বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসঃ মৃত্তিকা থেকেই হোক পৃথিবী সুরক্ষার সূচনা

মৃত্তিকা সর্বংসহা। হ্যাঁ, লক্ষ-কোটি বছর ধরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে, নবরূপে রূপান্তরিত হয়ে সে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। যে মৃত্তিকা পরম মমতায় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মানবকুলের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের যোগান দিয়ে যাচ্ছে সেই মৃত্তিকার উপর দাঁড়িয়ে কখনো কি ভেবে দেখেছি সে কেমন আছে? ভেবেছি কি, মৃত্তিকা না থাকলে আমাদের অস্তিত্ব থাকতো কি না?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *